দেশের সড়কগুলো যেন মৃত্যুর উপত্যকা! ঈদের আনন্দ যেখানে মানুষের ঘরে ঘরে হাসি আর মিলনের বার্তা নিয়ে আসে, সেখানে অসংখ্য পরিবারে এবার নেমে এসেছে শোকের কালো ছায়া। কারও সন্তান আর বাড়ি ফিরবে না, কারও স্বামী ঈদের নতুন জামা পরে বের হয়ে আর ফিরে আসেননি, কোথাও বাবা হারিয়ে এতিম হয়েছে ছোট্ট শিশু। এক দিনের ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ১৯ জনের মৃত্যু যেন আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, বাংলাদেশের সড়ক এখনো কতটা অনিরাপদ, কতটা অব্যবস্থাপনার মধ্যে ডুবে আছে।
গত বুধবার সন্ধ্যা থেকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, দিনাজপুর, নরসিংদী, গাইবান্ধা, পটুয়াখালী, কুষ্টিয়া, মাদারীপুর ও নড়াইলে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাগুলো শুধু সংখ্যা নয়; প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে আছে একেকটি পরিবারের চিরস্থায়ী কান্না। নিহতদের মধ্যে ১১ জন মোটরসাইকেল আরোহী। তিন শিশু ও দুই কিশোরও প্রাণ হারিয়েছে। কেউ বাড়ি ফিরছিলেন বাবা-মায়ের সঙ্গে ঈদ করতে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে বের হয়েছিলেন, কেউ আবার কর্মস্থলে ফেরার পথে বাস দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।
যে ঘরে ঈদের দিন কোরবানির মাংস রান্না হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন নিস্তব্ধতা। অনেক ঘরে চুলা জ্বলেনি। আত্মীয়-স্বজনের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে উঠান। স্বজন হারানোর শোক ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এক মা হয়তো বারবার সন্তানের ফোন নম্বরে কল দিচ্ছেন, কিন্তু ওপাশ থেকে আর কোনো সাড়া আসবে না। এক স্ত্রী হয়তো এখনো দরজার দিকে তাকিয়ে আছেন, যদি মানুষটা ফিরে আসে। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা মানুষকে শুধু হত্যা করে না, একটি পরিবারের স্বপ্ন, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎও কেড়ে নেয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই মৃত্যুর দায় কার? প্রতিবছর ঈদ এলেই কেন একই চিত্র দেখতে হয়? অতিরিক্ত যাত্রীচাপ, বেপরোয়া গতি, অনিয়ন্ত্রিত মোটরসাইকেল চলাচল, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, ফিটনেসবিহীন যানবাহন—এসব যেন স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। অথচ সড়ক ব্যবস্থাপনায় আধুনিক, বিজ্ঞানভিত্তিক কোনো কার্যকর পরিকল্পনা এখনো গড়ে ওঠেনি। উন্নত বিশ্বের মতো ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, যাত্রীচাপ নিয়ন্ত্রণ কিংবা নিরাপদ গণপরিবহন নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র কতটা আন্তরিক—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রায়ই বলা হয়, যাত্রীদের অসচেতনতার কারণেই দুর্ঘটনা ঘটে। কিন্তু দায় কি শুধুই সাধারণ মানুষের? যখন মহাসড়কে শৃঙ্খলা নেই, যখন চালকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত হয় না, যখন আইন প্রয়োগে দুর্বলতা থাকে, তখন দুর্ঘটনার দায় এড়ানোর সুযোগ কোথায়? প্রতিটি মৃত্যুর পর তদন্ত কমিটি হয়, শোক প্রকাশ করা হয়, কিন্তু বাস্তব পরিবর্তন খুব কমই চোখে পড়ে।
সড়কে প্রাণ হারানো মানুষগুলো কোনো পরিসংখ্যান নয়। তারা কারও সন্তান, কারও বাবা, কারও স্বপ্ন। ঈদের আনন্দ ম্লান করে দেওয়া এই মৃত্যুগুলো আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার নির্মম প্রতিচ্ছবি। যতদিন না নিরাপদ সড়ককে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, ততদিন দেশের সড়কগুলো এভাবেই মানুষের স্বপ্ন আর জীবন গ্রাস করতে থাকবে। আর প্রতিটি উৎসবের পর নতুন নতুন পরিবার যোগ হবে শোকের মিছিলে।
- বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, প্রশাসন নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে যাত্রীদের সচেতন অভাব বলেই খালাস। কিন্তু তারা সিস্টেমহীন অবস্থায় সড়ক পরিচালনা করছেন। উৎসব-পার্বনে যানবাহন পরিচালনার নিয়ম-কানুনের বালাই নেই। অথচ নিজেরা দাবি করছেন, সবচেয়ে ভালো ব্যবস্থানায় তারা রয়েছেন। যখন সড়কগুলোতে লাশের মিছিল, তখন প্রশাসনের গর্বের দাবি কিছুতেই সমর্থনযোগ্য হতে পারেনা।
একদিনে ঝরলো ১৯ প্রাণ
ঈদের ছুটিকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন জেলায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ১৯ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বেদগ্রাম এলাকায় দোলা পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস উল্টে পাঁচজন নিহত এবং অন্তত ২৫ জন আহত হন। নিহতদের মধ্যে এক শিশু, এক নারী ও তিনজন পুরুষ রয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, বেপরোয়া মোটরসাইকেলকে বাঁচাতে গিয়ে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়। নিহতদের মধ্যে শয়ন ঢালী (২০), খাদিজা খাতুন (৩৫) ও সোহাগ (৩৭)-এর পরিচয় জানা গেছে।
এ ছাড়া ফরিদপুর, নরসিংদী, পটুয়াখালী, নড়াইল ও কুষ্টিয়ায় পৃথক মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নয়জন নিহত হয়েছেন। পটুয়াখালীর গলাচিপায় ঈদের নামাজ শেষে ঘুরতে বের হয়ে মোটরসাইকেলের সঙ্গে অটোরিকশার সংঘর্ষে দুই কিশোর ফয়সাল হাওলাদার (১৬) ও তামিম মাতুব্বর (১৬) মারা যায়। নরসিংদীর শিবপুরে দুই মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে রুমান মিয়া (২৬) ও চান মিয়া (১৯) নিহত হন।
ফরিদপুরের ভাঙ্গায় পৃথক দুর্ঘটনায় তিনজন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে মহাসড়কে দুই মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে সাইফুল মোল্লা (২৫) ও আল ইমরান শরীফ (২৮) নিহত হন। অন্যদিকে নড়াইলের লোহাগড়ায় বাসের সঙ্গে সংঘর্ষে সাব্বির গাজী (১৮) নামে এক তরুণ মারা যান। দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে মহাসড়কে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকের পেছনে সিএনজিচালিত অটোরিকশার ধাক্কায় দুই শিশু নিহত হয়েছে। এছাড়া মাদারীপুরের শিবচরে বাস থেকে ছিটকে পড়ে সাত্তার হাওলাদার (৫৫) নিহত হন।
গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতেও বাসচাপায় অটোরিকশার দুই যাত্রী নিহত হয়েছেন। নিহতদের একজন স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতা হাসান আলী প্রধান (২৬)। এসব দুর্ঘটনায় বহু মানুষ আহত হয়েছেন।
কালের সমাজ/এএইচবি/এসআর

