ঢাকা সোমবার, ০৮ জুন, ২০২৬, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
৩৮.৮৩ শতাংশই মোটরবাইক

ঈদ যাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪০২ জন

আমিনুল হক ভূইয়া | জুন ৭, ২০২৬, ০১:২৫ পিএম ঈদ যাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত  ৪০২ জন

ঈদুল আযাহায়  দেশজুড়ে ৩৯৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪০২ এবং আহতর তালিকায় রয়েছেন ১২৯৪ জন।  এরমধ্যে অনেকের অবস্থা গুরুতর। একই সময়ে রেলপথে ৩১টি দুর্ঘটনায় নিহত ২৩ জন এবং আহত হয়েছেন ৩০ জন। নৌপথে ১৭টি দুর্ঘটনায় ১৩ জন নিয়ত ও ১৬ জন আহত হবার খবর পাওয়া গেছে। সড়ক, রেল ও নৌ-পথ্যে সর্বমোট ৪৪২টি দুর্ঘনায় ৪৩৮ জন নিহত এবং ১৩৪০ জন আহত হয়েছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যান সমিতির সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেলের প্রতিবেদনে এই তথ্য ওঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, বরাবরের মতো এবারও দুর্ঘটনার শীর্ষে রয়েছে মোটরসাইকেল। এবারের ঈদে ১৫৩ টি মোটরসাইকেল দুর্ঘনায় ১৫৯ জন নিহত, ১৮০ জন আহত হয়েছে। যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৮.৮৩ শতাংশ।

ঈদযাত্রা শুরুর দিন ২১ মে থেকে ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফেরা ৪ জুন পর্যন্ত বিগত ১৫ দিনে ৩৯৪ টি সড়ক দুর্গটনায় ৪০২ নিহত ও  আহত হয়েছে ১২৯৪ জন। বিগত ২০২৫ সালের ঈদুল আযাহায় ৩৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৯০ জন নিহত ও ১১৮২ জন আহত  হয়েছিলো। বিগত ঈদুল আজহার সাথে তুলনা করলে সড়ক দুর্ঘটানা ৩.৯৫ শতাংশ, প্রাণহানী ৩.০৭ শতাংশ, আহত ৯.৪৭ শতাংশ ড়েছে।

রোববার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে যাত্রী কল্যাণ সমিতি আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী এই তথ্য তুলে ধরেন। এসময় তিনি বলেন, প্রতিবছর দুই ঈদে বিপল সংখ্যক মানুষ রাজধানী থেকে সারাদেশে যাতায়াত করে। ঈদকে কেন্দ্র করে সরকারের ১০/১২ দিনের তৎপরতা নয় বরং ঈদযাত্রায় বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবন বাঁচাতে, নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা জরুরী। ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তি কমাতে উন্নত বিশ্বের আদলে সরকারি বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে উন্নত যাতায়াতে স্বল্পমেয়াদী, মধ্যমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

সবার আগে দেশের গণপরিবহন সেক্টরে প্রযুক্তি নির্ভর সড়ক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। ছোট ছোট যানবাহন মহাসড়ক থেকে তুলে নিতে হবে। চালকদের উন্নত প্রশিক্ষণ প্রদানের লাইসেন্স প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কে স্টার মারি পিড়িত নিরাপত্তা করিডোর গড়ে তোলা সময়ের দাবী জানায় যাত্রী কল্যাণ সমিতি।  

যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণ চিত্র তুলে ধরে মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, দেশের সড়ক-মহাসড়কের বড় অংশ বৃষ্টির কারনে ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এসব কারণে বেপরোয়া গতির মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেড়েছে। ভাঙ্গা ছেঁড়া সড়কে বিদ্যমান নানাবিদ ত্রুটি ও  চালকদের আইন অমান্য করার সংস্কৃতি অতিতের মতো ধারাবাহিকভাবে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে।

এছাড়া ঈদ মৌসুমে চালক সংকটের কারণে ৮০ শতাংশ যানবাহন বিরামহীন ও বিশ্রামহীনভাবে একজন চালক দিয়ে যানবাহন চালারোর কারণে দুর্ঘটনা সংগঠিত হয়েছে। কতিপয় বাস মালিকের অতিরিক্ত মুনাফা আদায়ের কারণে মেয়াদউত্তীর্ণ যানবাহন সড়কে চলাচলের সুযোগ পাওয়া এবং প্রতিযোগিতামূলক যানবাহন চালাতে গিয়ে যাত্রী বোঝাই বাস খাল-বিল এবং ধান ক্ষেতে পড়ে বেঘোরে মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।

ঈদ যাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনার পর ৮০ জন চালক জনরোষের শিকার হয়েছেন। এছাড়া ৮৯ জন পরিবহন শ্রমিক, ৫৯ জন পথচারী, ৬৪ জন নারী, ৪৫ জন শিশু, ৬৬ জন শিক্ষার্থী,  ৫ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ৩ জন শিক্ষক, ১ জন চিকিৎসক ও  রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর পরিচয় মিলেছে।

দুর্ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যানবাহনের ২৮.৯০ শতাংশ মোটরসাইকেল, ২১০ শতাংশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান, ১৯.৫৬ বাস, ১২.৩৪ শতাংশ অবৈধ ব্যাটারি যানবাহন, ৭.৮১ শতাংশ কার-মাইক্রো, ৬.৫৬ শতাংশ নছিমন-করিমন ও ৬.৪০ শতাংশ সিএনজি চালিত অটোরিক্সা এসব দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল।

এসব দুর্ঘটনার মধ্যে ৪৪ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ২৯.১৮ শতাংশ গাড়ী চাপা বা ধাক্কা দেয়ার ঘটনা, ১৭.২৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রন হারিয়ে খালে শতাংশ ট্রেন-যানবাহনে ও ৫.৫৮ শতাংশ অন্যান্য অজ্ঞাত কারনে দুর্ঘটনা সংগঠিত হয়েছে।

দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট সংঘটিত দুর্ঘটনার ৫০.৫০ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ৩০.৭১ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে, ১৪.৪৬ শতাংশ ফিডার রোডে সংঘটিত হয়। এছাড়াও সারাদেশে সংঘটিত মোট দুর্ঘটনার ২.৫৩ শতাংশ ঢাকা মহানগরীতে, ০.২৫ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে ও ১.৫২ শতাংশ রেলক্রসিংয়ে সংগঠিত হয়েছে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে দুর্ঘটনার  কিছু  কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, জাতীয় মহাসড়কে মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিক্সা, অটোরিক্সা অবাধে চলাচল। জাতীয় মহাসড়কে রোড সাইন বা রোড মার্কিং, সড়কবাতি না থাকায় হঠাৎ ফিডার রোড থেকে যানবাহন উঠে আসা। সড়কে মিডিয়ান বা রোড ডিভাইডার না থাকা, সড়কে গাছপালায় অন্ধবাকের সৃষ্টি।  মহাসড়কের নির্মাণ ত্রুটি, যানবাহনের ত্রুটি, ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা।

উল্টোপথে যানবাহন, সড়কে চাদাঁবাজি, পণ্যবাহী যানে যাত্রী পরিবহন, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত যাত্রীবহন, বেপরোয়া যানবাহন চালানো এবং বিরামহীন ও বিশ্রামহীনভাবে যানবাহন চালানো, বৃষ্টিতে সড়কের মাঝে গর্তের সৃষ্টি , ভাঙ্গাছেঁড়া সড়ক, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কারণে নিম্নআয়ের মানুষ বাসের ছাদে, ট্রাকের ছাদে, পণ্যবোঝাই ট্রাকের উপর যাতায়াতে বাধ্য হওয়ার কারণে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে।

ঈদে বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানী ও যাতায়াতের ভোগান্তি কমাতে যাত্রী কল্যাণ সমিতির সুপারিশসমূহে বলা হয়েছে,  ঈদযাত্রায় স্বল্পমেয়াদী, মধ্যমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রনয়ণ ও বাস্তবায়ন করা জরুরী, সারাদেশে উন্নত বিশ্বের আদলে আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক ও   প্রযুক্তি নির্ভর সড়ক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা।

চালকদের উন্নত প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে লাইসেন্স প্রাপ্তি নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কে ফুটপাতসহ সার্ভিস লেইনের ব্যবস্থা করা, কাঠামোগত সংস্কার করে সড়কে চাদাঁবাজি বন্ধ করা, চালকের বেতন ও কর্মঘন্টা সুনিশ্চিত করা, মহাসড়কে ফুটপাত ও পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা রাখা, রোড সাইন, রোড মার্কিং স্থাপন করা ও  মানসম্মত সড়ক নির্মাণ ও মেরামত সুনিশ্চিত করা, নিয়মিত রোড সেইফটি অডিট করা।

ফিটনেস প্রদান পদ্ধতি আধুনিকায়ান, মেয়াদোত্তীন গণপরিবহন উচ্ছেদ করা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি  ট্রাফিক ট্রেনিং একাডেমী গড়ে তোলা। পরিবহন সেক্টর পরিচালনায় বাস মালিক সমিতি ও শ্রমিক ফেডারেশনের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করা।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, সরকারের সাবেক সচিব ড.এ ওয়াই এম একরামুল হক, সংগঠনের যুগ্ম মহাসচিব অর্পনা রায় দাশ, অর্থ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান রাসেল, দপ্তর সম্পাক আলমগীর কবির লিটু, মনজুর হোসেন ইসা, সুবাস চন্দ্র দাশ, মনজুর হোসেন।

কালের সমাজ/এএইচবি 

 

 

Link copied!