বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে চীনে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃ পক্ষ (বিডা) প্রথম বিদেশি অফিস স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন থেকে আরও বেশি বিনিয়োগ বাংলাদেশে আসবে এবং শিল্প খাতের বিকাশে নতুন গতি সঞ্চার হবে।
চায়না-সাউথ এশিয়া এক্সপোতে অংশ নিয়ে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী জানিয়েছেন, আগামী তিন মাসের মধ্যেই চীনে বিডার প্রথম বিদেশি অফিস চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের ১৮০ দিনের সংস্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
চীনা গণমাধ্যম সিজিটিএন তাদের এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদন, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও রপ্তানি খাতে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং উৎপাদন কেন্দ্র বৈচিত্র্যকরণের কারণে অনেক চীনা প্রতিষ্ঠান বিদেশে বিনিয়োগের নতুন গন্তব্য খুঁজছে। বাংলাদেশ তার বৃহৎ শ্রমবাজার, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং ক্রমবর্ধমান ভোক্তা বাজারের কারণে চীনা বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
গত বছরের শেষ দিকে বিডার অধীনে একটি বিশেষ ‘চায়না ডেস্ক’ চালু করা হয়। এই ডেস্কে কর্মরত কর্মকর্তারা শুধুমাত্র চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য সেবা প্রদান করছেন। বিনিয়োগ সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ, অনুমোদন প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা দ্রুত সমাধানের মাধ্যমে চীনা বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।
বিডার নতুন বিদেশি অফিস চালু হলে চীনা উদ্যোক্তারা সরাসরি বাংলাদেশ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ, বিনিয়োগ সম্ভাবনা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা গ্রহণের সুযোগ পাবেন। এতে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় ও ব্যয় কমবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ উৎস পর্যায়েই সমাধান করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। বিডার বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সৌদি আরবের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম বিদেশি বিনিয়োগের উৎস ছিল চীন। এ সময়ে মূল ভূখণ্ড চীন থেকে ৪ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার এবং হংকং থেকে ১৭৩ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এসেছে। উৎপাদন শিল্প, বিদ্যুৎ, অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলভিত্তিক প্রকল্পগুলোতে এসব বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এদিকে, বিনিয়োগ আকর্ষণের অংশ হিসেবে বিডা ১৩টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত অবকাঠামো প্রকল্প চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে বৃহৎ আকারের শিল্প বিনিয়োগের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে এবং কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের সুযোগ বাড়বে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ একটি দেশের শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম প্রধান মাধ্যম। ফলে চীনে বিডার অফিস স্থাপনের উদ্যোগ শুধু বিনিয়োগ আকর্ষণের কৌশল নয়, বরং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কালের সমাজ/এএইচবি

