ঢাকা সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬, ১ আষাঢ় ১৪৩৩

চীনের অর্থায়নে দ্বিতীয় পদ্মা-যমুনা সেতুসহ বড় অবকাঠামো প্রকল্পের পরিকল্পনা

বিশেষ প্রতিনিধি | জুন ১৫, ২০২৬, ০২:২২ পিএম চীনের অর্থায়নে দ্বিতীয় পদ্মা-যমুনা  সেতুসহ বড় অবকাঠামো প্রকল্পের পরিকল্পনা

ঢাকায় সাবওয়ে, রেললাইন সম্প্রসারণ এবং আধুনিক রেল অবকাঠামো নির্মাণসহ প্রায় ২০টি প্রকল্পের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরে প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে কয়েক লাখ কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে। তবে তালিকাভুক্ত সব প্রকল্পের জন্য অর্থায়ন পাওয়া যাবে কি না, কিংবা সবগুলো একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে থাকা প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।

দ্বিতীয় যমুনা ও পদ্মা সেতুতে গুরুত্ব

চীনা অর্থায়নের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে সেতু বিভাগ। তাদের তালিকায় অগ্রাধিকারের শীর্ষে রয়েছে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণ। প্রস্তাব অনুযায়ী, জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ ও গাইবান্ধার বালাসীঘাটের মধ্যে নতুন সেতু নির্মাণ করা হবে। বর্তমানে সেতুটির সম্ভাব্য অবস্থান নির্ধারণে তিনটি অ্যালাইনমেন্ট নিয়ে সমীক্ষা চলছে।

বর্তমান যমুনা সেতু দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৩ হাজার যানবাহন চলাচল করে। ঈদসহ বিশেষ সময়ে এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়, ফলে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। এ পরিস্থিতিতে নতুন সেতুর প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত।

একই সঙ্গে গুরুত্ব পাচ্ছে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্প। প্রস্তাবিত সেতুটি মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ও রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ার মধ্যে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পদ্মা সেতুর স্থান নির্ধারণের সময় এ রুটটিও বিবেচনায় ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত মাওয়া-জাজিরা রুটে বর্তমান পদ্মা সেতু নির্মিত হয়। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম উড়াল মহাসড়কের প্রস্তাব

চীনা অর্থায়নের জন্য প্রস্তাবিত বড় প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকা-চট্টগ্রাম উড়াল মহাসড়ক নির্মাণ। দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত এ মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন ৩০ হাজারের বেশি যানবাহন চলাচল করে। রাজধানী ও প্রধান সমুদ্রবন্দরের মধ্যে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হওয়ায় এ সড়কের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।

এর আগে ২১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে নানা কারণে ২০২১ সালে প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যায়। বর্তমানে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর বিদ্যমান চার লেনের মহাসড়ককে ১০ লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা করছে। অন্যদিকে সেতু বিভাগ পুরো পথটিকে উড়াল মহাসড়কে রূপ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।

ঢাকার জন্য সাবওয়ে ও নতুন এক্সপ্রেসওয়ে

রাজধানীর যানজট নিরসনে ঢাকায় সাবওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনাও চীনা অর্থায়নের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী, ১১টি রুটে মোট ২৩৮ কিলোমিটার সাবওয়ে নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রথম ধাপে চারটি রুট বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে, যার সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা।

এ ছাড়া সাভারের হেমায়েতপুর থেকে কেরানীগঞ্জ হয়ে নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দ পর্যন্ত প্রায় ৩৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা শহরের ওপর যানবাহনের চাপ কমবে এবং ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে নতুন সংযোগ তৈরি হবে বলে সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।

সেতু বিভাগের প্রস্তাবিত প্রকল্পের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের মধ্যে আরেকটি সেতু নির্মাণের বিষয়ও রয়েছে। এর আগে চীনের অনুদানে নির্মিত মুক্তারপুর সেতু পরবর্তীতে একই দেশের সহায়তায় সংস্কার করা হয়েছিল।

রেল খাতে নতুন বিনিয়োগের উদ্যোগ

চীনা অর্থায়নের জন্য পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প নির্বাচন করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এর মধ্যে রয়েছে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি ও অব্যবহৃত চীনা ঋণের অর্থ ছাড়ের উদ্যোগ।

রেলের মিটারগেজ ইঞ্জিন সংকট মোকাবিলায় চীনের অনুদানে ২০টি নতুন ইঞ্জিন সংগ্রহের পরিকল্পনাও রয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ১ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের মাধ্যমে এসব ইঞ্জিন সংগ্রহের প্রস্তাব করা হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত আখাউড়া-সিলেট রেলপথকে মিশ্র গেজে রূপান্তরের প্রকল্পটিও আবার সামনে এসেছে। প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটি একসময় স্থগিত হয়ে গেলেও চীনা প্রতিষ্ঠান আবার আগ্রহ দেখিয়েছে। একইভাবে জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ-জামালপুর রেলপথে নতুন মিশ্র গেজ লাইন নির্মাণ প্রকল্পও পুনরায় আলোচনায় এসেছে।

এ ছাড়া ২০০টি মিটারগেজ কোচ আমদানি এবং রাজবাড়ীতে আধুনিক রেলওয়ে ওয়ার্কশপ স্থাপনের জন্যও চীনা অর্থায়ন চাওয়া হয়েছে।

পরিকল্পিত উন্নয়নের ওপর জোর

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরও নতুন কয়েকটি সেতু ও এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের জন্য চীনা সহায়তা চেয়েছে। এর মধ্যে পটুয়াখালীর বাউফল ও দুমকির মধ্যে লোহালিয়া নদীর ওপর নতুন চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সেতু নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বড় প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্কতার পরামর্শ দিয়েছেন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, অতীতে অনেক বড় অবকাঠামো প্রকল্প পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে প্রত্যাশিত সুফল দিতে পারেনি। তাঁর মতে, নতুন কোনো প্রকল্প গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট সেবা, সংযোগ ব্যবস্থা এবং সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, নগর পরিবহন ব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নয়নেও গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিক ও সমন্বিত করতে চীনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে।

সব মিলিয়ে চীনের অর্থায়নে দ্বিতীয় পদ্মা ও যমুনা সেতুসহ একাধিক বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা দেশের যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। তবে এসব প্রকল্পের সফলতা নির্ভর করবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।
কালের সমাজ/এএইচবি 
 

অর্থনীতি বিভাগের আরো খবর

Link copied!