দেশের যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে বড় অঙ্কের বরাদ্দের প্রস্তাব করেছে সরকার। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিমান, রেল, সড়ক, সেতু ও নৌপরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে মোট ৬০ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিদায়ী ২০২৫–২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ৪৮ হাজার ২৯২ কোটি টাকা।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করতে আধুনিক ও সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
অর্থমন্ত্রী জানান, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে সড়ক ও নগর পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর মধ্যে মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ, অর্থনৈতিক করিডোর উন্নয়ন, এবং মাল্টিমোডাল যোগাযোগ হাব গড়ে তোলার উদ্যোগ রয়েছে।
সড়ক নিরাপত্তা জোরদারে ৯৪টি প্রকল্প চলমান রয়েছে। পাশাপাশি “সেফটি সিস্টেম অ্যাপ্রোচ” ভিত্তিক সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্প পুনরায় চালু করা হয়েছে। যানবাহনের ফিটনেস ব্যবস্থাকে অটোমেশন করা এবং পেশাদার চালক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও জোরদার করা হচ্ছে।
ঢাকা কেন্দ্রিক যানজট কমাতে রিং রোড ও রেডিয়াল রোড নির্মাণ পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। এছাড়া ৩ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ জাতীয় এক্সপ্রেসওয়ে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সম্ভাব্য করিডোর চিহ্নিত করা হয়েছে।
রেলপথে প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন
রেল খাতে সক্ষমতা বাড়াতে আধুনিক লোকোমোটিভ, কোচ ও ওয়াগন সংগ্রহের পাশাপাশি ডুয়াল গেজ ডাবল লাইন এবং উন্নত সিগন্যালিং ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
সব জেলাকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনা এবং বন্দরগুলোর সঙ্গে সংযোগ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সৈয়দপুর ও পাহাড়তলী রেলওয়ে ওয়ার্কশপ আধুনিকায়ন ও স্থানীয়ভাবে রেল কোচ সংযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধির কথাও জানান মন্ত্রী।
ঢাকা–চট্টগ্রাম রুটে ঢাকা–কুমিল্লা অংশে নতুন কর্ডলাইন নির্মাণের মাধ্যমে প্রায় ৮০ কিলোমিটার পথ কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। চট্টগ্রামকে একটি লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
নৌপথ ও বন্দরের উন্নয়ন
নৌপরিবহন খাতে ড্রেজিং, বন্দর আধুনিকায়ন এবং অভ্যন্তরীণ নৌপথ উন্নয়নে ব্যাপক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং চট্টগ্রাম বে-টার্মিনাল ও পতেঙ্গা টার্মিনাল নির্মাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
লালদিয়া কন্টেইনার টার্মিনালসহ নতুন অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ সচল রাখতে নিয়মিত ড্রেজিং কার্যক্রমও জোরদার করা হচ্ছে।
বিমান খাতে আঞ্চলিক হাব গঠনের লক্ষ্য
বেসামরিক বিমান পরিবহন খাতে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে পরিণত করার পরিকল্পনার কথা জানান অর্থমন্ত্রী। ২০৩৪ সালের মধ্যে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বিমান যোগাযোগ কেন্দ্র হিসেবে দেশকে গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিমানবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ লজিস্টিক ও যাত্রী হাবে উন্নীত করার পাশাপাশি কক্সবাজার, যশোর, রাজশাহী ও সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক গেটওয়ে হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ ক্রয়ের চুক্তি এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর প্রস্তুতির কথাও জানান তিনি।
অর্থনৈতিক লক্ষ্য ও বাজেট কাঠামো
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ৩.৬ শতাংশ।
সরকারের লক্ষ্য আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রস্তাবিত এই বাজেটের মাধ্যমে সরকার অবকাঠামো খাতে বড় বিনিয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্ত করার চেষ্টা করছে।
কালের সমাজ/কে.পি

