ঢাকা সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬, ১ আষাঢ় ১৪৩৩
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন

কৃষি-অর্থনীতিতে সরকারি ব্যয়ের পুনর্বিন্যাস টেকসই উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত

বিশেষ প্রতিনিধি | জুন ১৫, ২০২৬, ১২:৫৫ পিএম কৃষি-অর্থনীতিতে সরকারি ব্যয়ের পুনর্বিন্যাস  টেকসই উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত
সংগৃহীত ছবি

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত বাংলাদেশের কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থায় গুণগত প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের জন্য কৃষি খাতে সরকারি ব্যয়ের পুনর্ব্যবহার শীর্ষক প্রতিবেদন দেশের কৃষি খাতের বর্তমান অবস্থা, চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। প্রতিবেদনটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে যে, কৃষি খাতে সরকারি ব্যয়ের কাঠামোগত সংস্কার এবং সম্পদের কার্যকর ব্যবহার বাংলাদেশের কৃষি-অর্থনীতিকে আরও উৎপাদনশীল, স্থিতিশীল ও কর্মসংস্থানমুখী করে তুলতে পারে।

বাংলাদেশ সরকার কৃষি খাতকে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে এবং মোট সরকারি ব্যয়ের প্রায় ১০ শতাংশ এ খাতে বরাদ্দ করে। তবুও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃষি প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়েছে এবং উৎপাদনশীলতার উন্নয়ন প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারেনি। অন্যদিকে, দেশের ভোক্তা চাহিদা ধীরে ধীরে ধাননির্ভর খাদ্যাভ্যাস থেকে ফল, শাকসবজি, মাছ, মাংস, ডিম ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের দিকে ঝুঁকলেও কৃষি উৎপাদনে সেই বৈচিত্র্য যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কৃষি মন্ত্রণালয়ের বাজেটের প্রায় ৮০ শতাংশ সার ভর্তুকিতে ব্যয় হয়। যদিও এই ভর্তুকি কৃষকদের উৎপাদন খরচ কমাতে এবং বাজারে মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে, তবে এর সুবিধা সমানভাবে বণ্টিত হচ্ছে না। অধিক জমির মালিক কৃষকরা ভর্তুকির বড় অংশ পাচ্ছেন, যেখানে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা তুলনামূলকভাবে কম সুবিধা ভোগ করছেন। এর ফলে সরকারি ব্যয়ের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দেশে সারের ব্যবহার এখনও ভারসাম্যপূর্ণ নয়। মাত্র ৫ শতাংশ কৃষক সুপারিশকৃত মাত্রায় সুষম সার প্রয়োগ করেন। এর ফলে মাটির উর্বরতা হ্রাস, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য ফলন অর্জনে ব্যর্থতা দেখা দেয়। সঠিক সার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে কৃষি উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেতে পারে এবং খাদ্য নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সরকারি ব্যয় বর্তমানে ধান উৎপাদনের দিকে অত্যধিক ঝুঁকে রয়েছে। দেশের প্রায় ৭২ শতাংশ কৃষিজমিতে ধান চাষ হয় এবং কৃষি ভর্তুকির প্রায় ৮০ শতাংশ এই খাতেই ব্যয় হয়। অথচ মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, শাকসবজি, ফলমূল ও কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প অধিক আয়, রপ্তানি সম্ভাবনা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই কৃষি খাতের দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের জন্য উৎপাদনের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি অপরিহার্য।

প্রতিবেদনটি কৃষি ব্যয়ের আধুনিকায়ন ও পুনর্বিন্যাসের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে মাটি পরীক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ, কৃষি সম্প্রসারণ ও পরামর্শ সেবা জোরদার করা, ডিজিটাল কৃষক কার্ড ও ই-ভাউচার চালু করা এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ও দরিদ্র কৃষকদের লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা প্রদান। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে এবং কৃষি খাত আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।

সার্বিকভাবে, বিশ্বব্যাংকের এই প্রতিবেদন বাংলাদেশের কৃষি-অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত দলিল। এটি কেবল কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পথ দেখায় না, বরং টেকসই উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র্য বিমোচন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ গঠনের জন্যও কার্যকর দিকনির্দেশনা প্রদান করে। যথাযথ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই সুপারিশগুলো দেশের কৃষি খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।
কালের সমাজ/এএইচবি 
 

অর্থনীতি বিভাগের আরো খবর

Link copied!