জুলাই আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলো বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। রাজধানী ঢাকা তখন আন্দোলন, সংঘর্ষ, আতঙ্ক এবং অনিশ্চয়তার এক অগ্নিগর্ভ নগরীতে পরিণত হয়েছিল। রাজপথজুড়ে ছিল টগবগে তারুণ্যের উপস্থিতি, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থান। সংঘাতের সেই দিনগুলোতে অসংখ্য প্রাণহানি, আহত হওয়ার ঘটনা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।
সেই সময়ের বহুল আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল রাজধানীর রামপুরায় এক তরুণের ছাদের কার্নিশে ঝুলে থাকার দৃশ্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই দৃশ্য অনেকের মনে গভীর নাড়া দিয়েছিল। জীবন বাঁচানোর শেষ চেষ্টায় এক নির্মাণাধীন ভবনের ছাদের কার্নিশের রড আঁকড়ে ঝুলে থাকা তরুণের অসহায়তা যেন আন্দোলনকালীন সময়ের ভয়াবহ বাস্তবতাকেই প্রতিফলিত করেছিল।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকেলে হোটেল কর্মচারী আমির হোসেন কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে রামপুরার বনশ্রী-মেরাদিয়া এলাকায় পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে যান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি দেখে তিনি আতঙ্কিত হয়ে একটি নির্মাণাধীন চারতলা ভবনে আশ্রয় নেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, একপর্যায়ে তিনি জীবন রক্ষার জন্য ভবনের ছাদের কার্নিশে ঝুলে থাকেন। সেই অবস্থায় তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। গুলিবিদ্ধ হয়ে নিচে পড়ে গেলে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে তিনি দীর্ঘ সময় চিকিৎসাধীন ছিলেন।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া মামলায় দুইজন নিহত হওয়ার অভিযোগসহ মোট পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও জোনের সাবেক এডিসি রাশেদুল ইসলাম, রামপুরা থানার সাবেক ওসি মশিউর রহমান, সাবেক এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার এবং সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া। বর্তমানে চঞ্চল চন্দ্র সরকার গ্রেপ্তার অবস্থায় রয়েছেন।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ মামলাটির রায়ের জন্য আগামী ২৮ জুন দিন নির্ধারণ করেছে। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ এই দিন ধার্য করেন।
এই মামলার রায় শুধু একটি নির্দিষ্ট ঘটনার বিচারিক নিষ্পত্তি নয়; বরং জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত ঘটনাবলীর বিচার প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। মানবাধিকারকর্মী, আইনবিদ, ভুক্তভোগী পরিবার এবং সাধারণ মানুষ অধীর আগ্রহে রায়ের অপেক্ষা করছেন।
জুলাই আন্দোলনের সেই অস্থির দিনগুলোর স্মৃতি এখনও অনেকের মনে তাজা। কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণের আতঙ্কিত মুখ, জীবন বাঁচানোর আকুতি এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ আজও জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। ২৮ জুনের রায় সেই প্রশ্নগুলোর কিছু উত্তর দিতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এই রায় আইনের শাসন, জবাবদিহিতা এবং মানবাধিকারের প্রশ্নে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হবে।
কালের সমাজ/এএইচবি

