ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ, ২০২৬, ২১ ফাল্গুন ১৪৩২

তেল সংকটের আশঙ্কায় পাম্পে দীর্ঘলাইন

নিজস্ব প্রতিবেদক | মার্চ ৫, ২০২৬, ০৮:৪৪ পিএম তেল সংকটের আশঙ্কায় পাম্পে দীর্ঘলাইন

সংশ্লিষ্ট্ররা বলছেন, ইরান যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশ-ভারতসহ বিশ্ববাজারেতেলের সঙ্কট দেখা যাবে। এরফলে তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের দাপট যত বাড়ছে, জ্বালানি সঙ্কটের আশঙ্কাও ততইবাড়ছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে কার্যত বন্ধ তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাঙ্কারের যাতায়াত। এতে গোটা বিশ্বের তথা এশিয়ার জ্বালানির সরবরাহে বড় ধাক্কা লেগেছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানি তেল (অকটেন,পেট্রোল ও ডিজেল) ও গ্যাস বিক্রির পাম্পগুলোতে যানবাহনের ভিড় ও দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। অনেক জায়গায় যানবাহনের সারি রাস্তায় ছড়িয়ে গেছে। কিছু পাম্পে আবার জ্বালানি তেল বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। এসব বিষয়ে কথা হয় জ্বালানি বিক্রয়কারী প্রতিনিধিদের সঙ্গে।

জ্বালানি বিক্রয়কারী প্রতিনিধিরা জানান,গত দ্-ুতিনদিন যাবত বেশির ভাগ ক্রেতাই ট্যাঙ্ক পূর্ণ করে জ্বালানি নি”েছন। এতে পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেলের রিজার্ভ কমে গেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বেলা ১১টার মধ্যে রাজধানীর দুটি জ্বালানি তেল বিক্রয়কেন্দ্রে সাময়িকভাবে বিক্রি বন্ধ রাখতে দেখা গেছে। এ ছাড়া একটি পাম্পে খোলা ড্রাম বা বোতলে ডিজেল বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে।

পাম্পগুলোর দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, জ্বালানি সরবরাহে স্বল্পতার কারণেই কিছু ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। এদিন সকাল সোয়া ৯টার দিকে মিরপুর-২ নম্বর সনি মোড়সংলগ্ন স্যাম অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড পাম্পে গিয়ে মোটরসাইকেল চালকদের লম্বা সারি ও ভিড় দেখা গেছে। বিক্রয়কর্মীরা জানালেন, চালকদের বেশির ভাগই ট্যাঙ্ক ফুল করে জ্বালানি কিনছেন। সেখানে কথা হয় সালাম মিয়া নামের এক মোটরসাইকলের চালকের সঙ্গে। তিনি অ্যাপে রাইড শেয়ারের কাজ করেন। সালাম বলেন, এমনিতে দিনে দুই থেকে তিনবার ২০০ থেকে ৩০০ টাকার তেল ভরি। কারণ, পকেটে টাকা থাকে না। তবে আজ জমানো কিছু টাকা একত্র করে ফুল ট্যাঙ্ক করলাম। ১ হাজার ৬০ টাকা লেগেছে।

ফুল ট্যাঙ্ক নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার রোজগারই হয় বাইক চালিয়ে। এখন তেল না পেলে বাইক যদি বন্ধ থাকে আমার সংসার চলবে কীভাবে? পাম্পটিতে ডিজেল খোলা বোতল বা ড্রামে বিক্রি বন্ধ রাখতে দেখা গেছে। রিকশায় করে ওই পাম্প থেকে ৩০ লিটারের ড্রামে ডিজেল নিতে এসেছিলেন পাইলিংয়ের কাজ করা শ্রমিক মাহফুজ আলী। তিনি বলেন, বলতেছে ডিজেল নাই। প্রতিদিনের কাজে ৩০ লিটার লাগে। গত দেড় মাস ধরে এই পাম্প থেকেই তেল কিনছি। আজকে বলছে ডিজেল নাই। কাজ বন্ধ রেখে ডিজেল কিনতে এসেছিলাম।

ডিজেল বিক্রি বন্ধ রাখার বিষয়ে স্যাম অ্যাসোসিয়েটস পাম্পের ক্যাশিয়ার শরীফ আহমেদ বলেন, পাম্পে সাধারণত ২০ থেকে ২৭ হাজার লিটার জ্বালানি মজুত থাকে। সেটা এখন প্রায় ৫ হাজারে নেমে এসেছে। ডিজেল প্রায় শেষের দিকে। তাই খোলা বিক্রি বন্ধ রেখে শুধু যানবাহনে দি”িছ। কারণ যানবাহনটা এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এদিন সকাল পৌনে ১০টার দিকে কল্যাণপুরের খালেক পাম্পেও যানবাহনের ভিড় দেখা গেছে। পাম্পটিতে মোটরসাইকেলের চাইতে দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাস ও ব্যক্তিগত গাড়ির চাপ বেশি ছিল।

পাম্পের এক বিক্রয়কর্মী জানান, বুধবার রাতে ও বৃহস্পতিবার সকাল থেকে যানবাহনের চাপ স্বাভাবিক সময়ের চাইতে দেড়-দুই গুণ বেশি ছিল। ওই পাম্পেও বেশির ভাগ ক্রেতা ট্যাঙ্ক ফুল করে জ্বালানি কিনছেন বলে জানান তিনিও। এদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আসাদগেটসংলগ্ন তালুকদার ফিলিং স্টেশনে গিয়ে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির ভিড় দেখা যায়। ব্যক্তিগত গাড়ির সারি মূল সড়ক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ায় পাম্পকে কেন্দ্র করে সড়কে যানজট সৃষ্টি হ”িছল। সেই যানজট নিরসনে কয়েকজন ট্রাফিক পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের তৎপরতা দেখা গেছে।
তবে এর প্রায় ৯ মিনিট পরেই ১০টা ৩৪ মিনিটের দিকে কর্মীরা পাম্পের ভেতরে ঢোকার অংশটি বাঁশ দিয়ে বন্ধ করে দেন। সড়কে দাঁড়িয়ে অনবরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা হাত নেড়ে সংকেত দিতে থাকেন পাম্প বন্ধ। এমন পরি¯ি’তিতে অনেকে পাম্প থেকে বেরিয়ে যাওয়ার গেট দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করেন।

তালুকদার ফিলিং স্টেশনের ক্যাশিয়ার ইমরান আহমেদ বলেন, এই পাম্পে দৈনিক প্রায় ৪০ হাজার লিটার জ্বালানি তেল আসে এবং বিক্রি করা হয়। মজুত থাকে ২০ হাজার লিটারের কাছাকাছি। কিš‘ ডিপো থেকে গাড়ি আসছে না। মজুত কমে গেছে। পাম্পের রিজার্ভ ট্যাঙ্কে ন্যূনতম ৪০০ লিটার রাখা লাগে। এখন প্রায় এর কাছাকাছি চলে এসেছে। তাই বিক্রি বন্ধ রাখা ছাড়া গতি নেই।
পাম্পটির ব্যব¯’াপক তন্ময় বাড়ৈ বলেন, যদি বিকেলে বা সন্ধ্যায় ডিপো থেকে গাড়ি আসে, তখন আবার বিক্রি করা হবে। তবে বরাদ্দ মাত্র ৪০ শতাংশ দেবে বলেও শুনতে পা”েছন তারা। এদিন বেলা পৌনে ১১টার দিকে বিজয় সরণির ট্রাস্ট রিফুয়েলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, ব্যক্তিগত যানবাহনের সারি পাম্পের নির্ধারিত সীমানা ছাড়িয়ে সড়কে অনেক দূর চলে গেছে। সারিতে অপেক্ষমাণ গাড়ির শেষ খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, সারির সর্বশেষ প্রান্তের গাড়ি দাঁড়ানো রয়েছে, নাখালপাড়া অংশে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ৪ নম্বর ফটকের বিপরীত পাশে। পাম্প থেকে প্রায় ৩৫০ মিটার দূরের ওই জায়গা পর্যন্ত ৯৭টি গাড়ি অপেক্ষায় থাকতে দেখা যায়। এদিন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কালশীর সুমাত্রা ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, সব ধরনের জ্বালানি তেল ও এলপিজি গ্যাস বিক্রি বন্ধ রেখেছে ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষ।

বিক্রয়কর্মীরা জানান, গতকাল রাতেই বেশির ভাগ জ্বালানির মজুত শেষ হয়েছে। তাই আজকে বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে।
এদিকে, চলতি মাসে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দুটি কার্গো দিতে পারবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে কাতার এনার্জি। এর পরিবর্তে উন্মুক্ত বাজার (স্পট মার্কেট) থেকে তা কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। কিš‘ বুধবার পর্যন্ত কোনো বিক্রেতার খোঁজ পায়নি। এ সপ্তাহের মধ্যে ওই দুই কার্গোর বিকল্প ব্যব¯’া করতে না পারলে ১৫ মার্চের পর দেশে ভয়াবহ গ্যাস সংকট দেখা দিতে পারে। শুরু হতে পারে গ্যাসেরও রেশনিং। তখন বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে শিল্প ও বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহ চালু রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ নিয়ে সর্বশেষ বুধবার সকালে সচিবালয়ে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। বৈঠকের পর জ্বালানিমন্ত্রী বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের ধাক্কা বাংলাদেশে চলে এসেছে। তাই তেল ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হোন। তিনি বলেন, জ্বালানি তেল এবং গ্যাসের বিকল্প খোঁজা হ”েছ। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে বিপণিবিতানগুলোতে আলোকসজ্জা করবেন না।

প্রসঙ্গত, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। এই যুদ্ধের ৭তম দিন। এরই মধ্যে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকিতে পড়েছে। 
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, দেশে বিশেষ করে ডিজেলের মজুত অনেক কম। মাত্র ৯ দিনের। গত ৩-৪ দিন বিভিন্ন পেট্রোলপাম্প এবং ডিলাররা দেদার ডিজেল উত্তোলন করে মজুত বা বিক্রি করেছে। স্বভাবত এই সময়ে দৈনিক ১১ থেকে ১২ হাজার টন বিক্রি হলেও এখন হ”েছ ১৩ হাজার টনের বেশি। এ কারণে দেশের ২ হাজার ৩০৭টি পাম্পকে তার স্বাভাবিক চাহিদার চেয়ে ১০ শতাংশ তেল কম দিতে বলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত সোমবার থেকে বিশ্ববাজারে পরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ২২ ডলারের বেশি বেড়েছে। ৮০ ডলারের তেল গিয়ে ঠেকেছে ১০৯ ডলারে। এ কারণে এখন প্রতি লিটার ডিজেলে সরকারের লোকসান ৪০ টাকার বেশি। হঠাৎ করে ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতিবেশী দেশ ভারতে পাচারের শঙ্কা করছে জ্বালানি বিভাগ।

 

Link copied!