যুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশের জন্য ১৯৭০-এর দশকে জিয়ার বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি কৌশল কতটা যুগান্তকারী ছিল, সে স্বীকৃতি তিনি আজও পাননি।
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন যে মূলত বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বর্তমানে দেশের মোট কর্মজীবী মানুষের ৯৫ শতাংশেরও বেশি বেসরকারি খাতে কর্মরত। বাংলাদেশের খাতভিত্তিক রূপান্তরের সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ হলো শিল্প ও উৎপাদন খাতের বিকাশ।
প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্বল্পকালীন শাসনামল দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিপথ আমূল পরিবর্তন করে এবং বেসরকারি খাতকে উন্নয়নের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। তাঁর শাসনামলের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে হলে তিনি যে অর্থনৈতিক নীতিগত পরিবেশ উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন, তা বোঝা জরুরি।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর নবগঠিত সরকার সকল বড় ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করে। মোট ৭২৫টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হয়, যার ফলে দেশের ৯০ শতাংশেরও বেশি শিল্পসম্পদ সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে, যা আমলাতন্ত্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল। ধীরগতির উন্নয়ন ও দুর্নীতির এক চিরাচরিত কাঠামো দেশের সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করেছিল।
জাতীয়করণের পক্ষে যুক্তি ছিল যে পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের মালিকরা এসব শিল্পসম্পদ পরিত্যাগ করে চলে গিয়েছিলেন এবং এগুলো পরিচালনার জন্য বেসরকারি খাতে পর্যাপ্ত দক্ষতা ও পুঁজি ছিল না। তবে প্রকৃত কারণ ছিল আদর্শিক। নতুন সরকার একটি সমাজতান্ত্রিক, রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল, যা তাদের ঘোষণাপত্র ও জনসমক্ষে দেওয়া প্রতিশ্রুতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল।
জাতীয়করণ নীতি সক্রিয়ভাবে বেসরকারি খাতকে সীমাবদ্ধ করার লক্ষ্যেই প্রণীত হয়েছিল। শিল্পে ব্যক্তিগত বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয় মাত্র ২৫ লাখ টাকার মতো।
তবে শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের অর্থনৈতিক নীতিকে তৎকালীন বৈশ্বিক উন্নয়ন-চিন্তার প্রেক্ষাপটে বিচার করতে হবে। ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয় নীতিমালা। পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক বিস্ময় তখনও প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল, যা ধারাবাহিকতার অভাব অনুভব করছিল।
বিশ শতকের অন্যতম প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ পল স্যামুয়েলসনের পাঠ্যপুস্তক প্রায় সত্তর বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অধ্যয়ন করে আসছে। সেখানে তাঁর উল্লেখকৃত সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনীতির বাণী আদলে রূপ পেলেও বাংলাদেশের সেই ধরনের রাষ্ট্রক্ষমতা ছিল না, যা বেসরকারি খাতকে নিয়ন্ত্রণ করতে বা সোভিয়েত রাষ্ট্রগুলোর মতো আদর্শগত শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারত। আজ আমরা সরকারি খাতের যে সমস্যাগুলো দেখি—দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, উৎপাদনশীলতার অভাব, রাজনৈতিককরণ, অতিরিক্ত জনবল, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অদক্ষতা—সবগুলো তখন বিদ্যমান ছিল।
ফলে শিল্পখাত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি না হয়ে অর্থনীতির ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এটি সীমিত সরকারি অর্থভাণ্ডারের ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করে।
১৯৭৭ সালের শুরুর দিকে বেসরকারি খাতের ঋণ ও পুঁজির সুযোগ সম্প্রসারণের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয় Investment Corporation of Bangladesh (ICB)। একই সঙ্গে Dhaka Stock Exchange (DSE) পুনরায় চালু করা হয়।
১৯৭৮ সালে বিদেশি বিনিয়োগে সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানার সুযোগ দেওয়া হয়। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য রপ্তানিমুখী শিল্পাঞ্চল বা Export Processing Zone (EPZ) গড়ে তোলা হয়।
সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ও পরিত্যক্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি মালিকানায় হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করে, যা পরবর্তীতে “বেসরকারিকরণ” নামে পরিচিত হয়। এ উদ্দেশ্যে সংবিধানও সংশোধন করা হয়। লক্ষ্য ছিল—একটি শক্তিশালী বেসরকারি খাতের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের সহাবস্থান নিশ্চিত করা।
১৯৭৬ থেকে ১৯৮২ সালের মধ্যে মোট ৩৬২টি প্রতিষ্ঠান বেসরকারি মালিকানায় হস্তান্তর করা হয়, যার মধ্যে ২৫৫টি ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এর মাধ্যমে ১৯৭৭-৭৮ সালের উৎপাদন খাতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ছিল ২.৫ শতাংশ, যা ১৯৭৮-৮০ সালের দুই বছরমেয়াদি পরিকল্পনায় বেড়ে ৬.৩ শতাংশে পৌঁছে।
এই উদারীকরণ ও বেসরকারিকরণ কর্মসূচির পেছনে World Bank এবং International Monetary Fund-এর মতো আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর শর্তও ভূমিকা রেখেছিল। তবে শুধুমাত্র বাইরের চাপের কারণে এই নীতিগুলো গ্রহণ করা হয়েছিল—এমন ধারণা সঠিক নয়। জিয়াউর রহমান শুরু থেকেই বেসরকারি খাতের কেন্দ্রীয় ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছিলেন।
১৯৭৭ সালের মে মাসে ঘোষিত তাঁর ১৯ দফা কর্মসূচিতে অর্থনৈতিক উদারীকরণ ও বেসরকারি খাতের বিকাশকে প্রধান নীতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
ব্যাংকিং সেক্টরে এই প্রয়াত নায়কের অবদান অনস্বীকার্য। ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা, যা পরবর্তীতে দেশের সর্ববৃহৎ বেসরকারি ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, একটি বিশাল আর্থিক উন্নয়ন হিসেবে বিবেচিত।
তিনি বিশ্বাস করতেন যে একটি দরিদ্র দেশের উন্নয়নে রাষ্ট্রেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই তিনি একটি মিশ্র অর্থনীতির ধারণা সমর্থন করতেন।
তাঁর প্রশাসনে দক্ষ আমলা, প্রযুক্তিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের একটি দল ছিল, যারা বিশ্বাস করতেন যে বাংলাদেশের উন্নয়নের পথ উদারীকরণ, নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ এবং বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করার মধ্যেই নিহিত।
পোশাক শিল্পের উত্থানেও জিয়াউর রহমানের প্রত্যক্ষ ভূমিকার উল্লেখ করা হয়।
এটাও প্রায়ই উপেক্ষিত হয় যে ১৯৭০-এর দশকে কোনো দরিদ্র উন্নয়নশীল দেশের জন্য এ ধরনের উদারীকরণ ও বেসরকারিকরণ নীতি গ্রহণ ছিল অত্যন্ত অস্বাভাবিক।
বাংলাদেশ ছিল বিশ্বের অল্প কয়েকটি দেশের একটি, যারা ১৯৭০-এর দশকেই উদারীকরণ ও বেসরকারিকরণ নিয়ে কার্যক্রম শুরু করেছিল।
সাহসী বাস্তববাদ ছিল জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রপতিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ যেমন তিনি তাঁর সহযোদ্ধাদের উদ্দেশে ঘোষণা করেছিলেন—“আমরা বিদ্রোহ করছি”—তেমনি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও তিনি প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে নতুন পথ দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন।
আজ সেই প্রয়াত নায়কের স্মরণে বাংলাদেশের অর্থনীতির তুলনা করলে দেখা যাবে, অর্থনীতির গতিপথ বদলে এক অজানা মাত্রায় অগ্রসর হচ্ছে, যা বিপজ্জনক। আবেগ ও বাস্তবতা ভিন্ন। তাই উন্নয়নশীল অর্থনীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে মেধা ও দক্ষতার দরকার। আর তাই রাজনীতি ও বিদ্বেষ পরিহার করতে হবে এবং যোগ্য ও দক্ষ নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। অতীতের গল্প ও রাজনৈতিক বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে দুর্নীতির অবসান ঘটিয়ে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।
তবেই সেই মহানায়কের আত্মবিসর্জন সার্থক হবে আর বাস্তব হবে—“সবার উপরে দেশ”।
লেখক : অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকার

