কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার রত্না পালং ইউনিয়নের পশ্চিম রত্না খালপাড়া এলাকার একটি পরিবার বছরের পর বছর ধরে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতার কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছে।
একই পরিবারের ছয়জন সদস্য দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। চরম দারিদ্র্য, চিকিৎসার অভাব ও সামাজিক অবহেলার মধ্যে দিন কাটানো পরিবারটির সদস্যরা উন্নত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পরিবারটির অধিকাংশ সদস্য জন্মগতভাবে কিংবা ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতার এই সমস্যা পরিবারটির একাধিক প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে। উপার্জনক্ষম সদস্য না থাকায় অভাব-অনটন যেন তাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিবারটির দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সদস্যরা হলেন— আরমান (২৫), জিহাদ (২৩), মাইমুন হাসান (১৯), আফিফা জান্নাত রিফা (৮), জামাল উদ্দিন (৫৫) এবং ছমুদা বেগম (৯০)। এর আগে একই পরিবারের আরও দুই সদস্য— জেসমিন আক্তার ও ইব্রাহিম মারা গেছেন। স্বজনদের দাবি, তারাও একই ধরনের সমস্যায় ভুগছিলেন।
পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে ভাতা পেলেও তা দিয়ে মাসের পুরো সময় চলা সম্ভব হয় না। ফলে বাকি সময় ধারদেনা ও অন্যের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়। নতুন একটা পোশাক কেনার সামর্থ্যও তাদের নেই। এমনকি গত রমজানে অনেক দিন শুধু পানি দিয়ে ইফতার করতে হয়েছে বলেও জানান তারা।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আরমান বলেন, “বর্তমানে আমাদের পরিবারে দাদি, বাবা, ভাই-বোনসহ ছয়জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ৬ জন সদস্য রয়েছেন। এর আগে আরও দুজন মারা গেছেন। সমাজসেবা থেকে যে ভাতা পাই, তা দিয়ে কোনোরকমে এক মাস চলে।
আমরা কথা বলতে পারি, কিন্তু চোখে দেখতে পাই না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা কিংবা উপজেলা প্রশাসনের কাছ থেকে ইতোপূর্বে তেমন কোনো সহযোগিতা পাইনি। রমজানে অনেক দিন শুধু পানি দিয়ে ইফতার করেছি।”
তিনি আরও জানান, ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন সরকারি সুবিধা পাওয়ার জন্য উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে একাধিকবার যোগাযোগ করলেও কাঙ্ক্ষিত সহায়তা পাননি। এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ঘুরতে হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, একই পরিবারের এতজন সদস্যের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হওয়া অত্যন্ত মর্মান্তিক ও বিরল ঘটনা। তারা সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
উপজেলা প্রতিবন্ধী নেতা রফিক উদ্দিন ফকির বলেন, “এটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ঘটনা। একই পরিবারের এতজন সদস্য দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। তাদের জন্য সরকারি বিশেষ সহায়তা, উন্নত চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা জরুরি।”
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম বলেন, “পরিবারটি সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে নিয়মিত ভাতা ও অন্যান্য সহায়তা পেয়ে আসছে। ভবিষ্যতে অতিরিক্ত কোনো সহযোগিতার সুযোগ এলে তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেওয়া হবে।”
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিফাত আসমা বলেন, “বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। পরিবারটির সার্বিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে গত শুক্রবার (২৯ মে) সন্ধ্যায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের কাছে কোরবানির মাংসসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।”
সম্প্রতি সহায়তা পাওয়ার পর দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী জামাল উদ্দিন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “ উপজেলা প্রশাসন এবার আমাদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতেও নতুন কোনো সহযোগিতা এলে তা দেওয়ার আশ্বাস পেয়েছি উখিয়ার মানবিক ইউএনও রিফাত আসমার কাছ থেকে।”
তিনি আরও জানান, স্থানীয় সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, উখিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি সরওয়ার জাহান চৌধুরী, রত্নাপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল হুদা, উখিয়া প্রেস ক্লাবের সভাপতি সাঈদ মুহাম্মদ আনোয়ার, ইউপি সদস্য সেলিম কায়ছার এবং সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী জামায়াত নেতা আজিজুল হক আজিজু-সহ অনেকেই সম্প্রতি তাদের খোঁজখবর নিয়েছেন এবং সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।
তবে পরিবারের সদস্যদের প্রধান দাবি একটাই— বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মাধ্যমে তাদের রোগের কারণ নির্ণয় করা হোক এবং সম্ভাব্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হোক। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় এনে পরিবারটিকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হোক। তাদের বিশ্বাস, যথাযথ চিকিৎসা ও রাষ্ট্রীয় সহায়তা পেলে হয়তো এই অন্ধকার জীবনে একদিন আলোর দেখা মিলতে পারে।
কালের সমাজ/কে.পি

