ফেনীতে গণঅভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থী মাহবুবুল হাসান মাসুম হত্যা মামলায় আত্মগোপনে থাকা ১৭৮ আসামিকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর আসামিদের গ্রেপ্তারে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
আসামিরা যাতে দেশত্যাগ করতে না পারেন, সে জন্য বিমানবন্দরগুলোতেও প্রয়োজনীয় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা, দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় দপ্তর উপকমিটির সদস্য খোন্দকার তারেক রায়হান, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এবং ফেনী-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারী।
আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট আদালতে হাজির হতে বলা হয়েছে আসামিদের। নির্ধারিত সময়ে হাজির না হলে তাদের অনুপস্থিতিতেই বিচার কার্যক্রম পরিচালিত হতে পারে।
গত ১৩ জুন ২০২৬ একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। ফেনীর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ ছালামাত উল্লাহ স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৮৭ ও ৮৮ ধারায় প্রয়োজনীয় কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, আসামিরা গ্রেপ্তার এড়াতে পলাতক বা আত্মগোপনে রয়েছেন—এমনটি বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আদালতের রয়েছে। তাদের শিগগির গ্রেপ্তারের সম্ভাবনাও নেই। এ কারণে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৩৯-বি(১) ধারার ক্ষমতাবলে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরবর্তী ১০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যথায় আসামিদের অনুপস্থিতিতেই বিচার কার্যক্রম চলতে পারে।
মামলা সূত্রে জানা যায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ফেনীর মহিপালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি করে মামলাটি করা হয়। এতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ ১৬২ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে আসামি করা হয়।
২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর নিহত শিক্ষার্থী মাহবুবুল হাসান মাসুমের ভাই মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান ফেনী মডেল থানায় মামলাটি করেন।
তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ৩১ জুলাই ফেনী মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আলমগীর হোসেন ২২১ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। পরে ২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি ফেনীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সদর আমলি আদালতের বিচারক মোহাম্মদ হাসান অভিযোগপত্র আমলে নেন। একই সঙ্গে শেখ হাসিনাসহ ১৭১ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
মামলার উল্লেখযোগ্য অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন ফেনী সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শুসেন চন্দ্র শীল, ফেনী পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মেয়র নজরুল ইসলাম স্বপন মিয়াজী, ছাগলনাইয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মেজবাউল হায়দার চৌধুরী সোহেল, দাগনভূঞা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা যুবলীগের সভাপতি দিদারুল কবির রতন, পরশুরাম উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মেয়র নিজাম উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী সাজেল, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মেয়র রফিকুল ইসলাম খোকন, ছাগলনাইয়া পৌরসভার সাবেক মেয়র মো. মোস্তফা, সোনাগাজী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জহির উদ্দিন মাহমুদ লিপটন, যুবলীগ নেতা সাইফুল ইসলাম পিটু ও জিয়া উদ্দিন বাবলুসহ অনেকে।
মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় গুলি চালানোর জন্য প্ররোচনা, উসকানি ও নির্দেশনার সঙ্গে আসামিরা জড়িত ছিলেন।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এ মামলায় এখন পর্যন্ত ৫১ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ফেনীর মহিপালে সংঘর্ষের সময় ছাগলনাইয়ার আবদুল হক চৌধুরী ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী মাহবুবুল হাসান মাসুম গুলিবিদ্ধ হন। তার মাথা, বুক ও পিঠে গুলি লাগে। পরে তাকে চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে ৭ আগস্ট তাকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেদিন সন্ধ্যায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ওই দিনের সহিংসতায় মোট নয়জন নিহত হন।
কালের সমাজ/কে.পি

