ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

প্রত্যাশা-চ্যালেঞ্জের সন্ধিক্ষণে আজ বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট

আমিনুল হক ভূইয়া | জুন ১০, ২০২৬, ১০:১০ পিএম প্রিন্ট সংস্করণ প্রত্যাশা-চ্যালেঞ্জের সন্ধিক্ষণে আজ বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট

দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আজ জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বিএনপি সরকারের প্রথম এবং দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। 

প্রত্যাশা, সম্ভাবনা ও নানা চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখে ঘোষিত হতে যাওয়া এই বাজেটকে ঘিরে জনমনে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। অর্থনীতির নানা চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বিনিয়োগে স্থবিরতার মধ্যেও সরকার উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির একটি উচ্চাভিলাষী রূপরেখা তুলে ধরতে যাচ্ছে। বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ৪ শতাংশ। এই ঘাটতি মোকাবিলায় ব্যাংকিং খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

নতুন বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং দেশীয় শিল্পখাতে ব্যাপক কর-সুবিধা দিয়ে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার আশা করছে, আগামী অর্থবছরে দেশের অর্থনীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই লক্ষ্য অর্জিত হলে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও জাতীয় আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আগামী বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

এদিকে নতুন অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ ৮ হাজার ৯২৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন করা হয়েছে। এর আগে একনেক সভায় ৩৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ের ‘পদ্মা ব্যারেজ’ প্রকল্পসহ মোট নয়টি মেগা প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়, যা সরকারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে, এই বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানো, বিনিয়োগে গতি আনা এবং উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের এক বড় পরীক্ষার মঞ্চ হতে যাচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে এগিয়ে নেওয়া। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম বাজেট। অর্থ মন্ত্রণালয় জানায়, অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ: ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে এবারের বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে অবকাঠামো উন্নয়নের তুলনায় মানবসম্পদ উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ কারণে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি দেশীয় শিল্পের বিকাশ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আসন্ন বাজেটে উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে ২২৫ কোটি টাকা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য ২ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের প্রস্তাব থাকতে পারে। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের ঘোষণাও আসতে পারে। এছাড়া ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ কর্মসূচি চালুর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বেশ কয়েকটি নতুন কর্মসূচি যুক্ত করার পাশাপাশি বিদ্যমান কর্মসূচিগুলোতে বরাদ্দ বাড়ানো হতে পারে। পাশাপাশি বিদেশে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে। যুবসমাজকে মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ থেকে দূরে রাখতে ও সৃজনশীল অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে উৎসাহ দেওয়ার লক্ষ্যে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব থাকতে পারে।

অর্থ মন্ত্রণালয় জানায়, আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ৬৮ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য বাজেটে মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বাকি অর্থ ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তা থেকে সংগ্রহ করা হবে। বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

এবারের বাজেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ব্যবসা পরিচালনা সহজ করার উদ্যোগ। লাইসেন্স, অনুমোদন ও কর ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনার পাশাপাশি বাংলাবিজ নামে একটি সমন্বিত ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যবসাসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাবে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কার্যক্রম আরও ব্যাপকভাবে অনলাইনে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। কর রিটার্ন অনলাইনে দাখিল, সরাসরি ব্যাংক হিসাবে কর ফেরত এবং কর-সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব আসতে পারে। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, চলতি বছরের মে মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে।

এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরে তা ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তাদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং বেসরকারি বিনিয়োগে গতি আনা ছাড়া উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।  এদিকে বাজেট বাস্তবায়নে রাজস্ব সংগ্রহ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মতো চ্যালেঞ্জ থাকলেও নীতিনির্ধারকেরা আশা করছেন, চলমান সংস্কার কার্যক্রম অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করবে।

অর্থমন্ত্রণালয় সূত্রের খবর,  এবারের বাজেটে সরকারের মূল দৃষ্টি থাকবে ডি-রেগুলেশন এবং সৃজনশীল অর্থনীতি দিয়ে ট্রিলিয়ন ডলারের রূপরেখা বাস্তবায়নে। পাশাপাশি দারিদ্র্য নিরসন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বাজেটে বিশেষ দৃষ্টি থাকবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে। এসব খাতে ব্যয় বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপি সরকারের ফ্ল্যাগশিপ কর্মসূচি হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে বাজেটে।

জানা গেছে,  নতুন সরকারের প্রথম বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আর্থিক খাতের দুঃশাসনের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরবেন। বক্তৃতার একটি জায়গায় বলা হয়েছে, ২০০৬ সালে বিএনপি সরকার বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ রেখে গিয়েছিল ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। ফ্যাসিবাদী সরকার পতনের সময় ৩০ জুন ২০২৪ সালে তা ৬ গুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৮ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা, যা সত্যিই উদ্বেগজনক। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাখা ৬৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ প্রায় ১৬ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকায়। সরকারের সুদ ব্যয়ের চিত্র সবচেয়ে উদ্বেগজনক। ২০০৫-০৬ সালে যেখানে সুদ পরিশোধ ছিল মাত্র ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ১৩ গুণেরও বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।

আগামী অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ লাখ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ছিল ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা, যা সংশোধন করে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে এনবিআর থেকে প্রায় ৬ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ধরা হতে পারে।

সূত্র জানায়, আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত এডিপির তুলনায় ৭০ হাজার কোটি টাকা বেশি এবং সংশোধিত এডিপির তুলনায় ১ লাখ কোটি টাকা বেশি। চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা সংশোধন করে ২ লাখ কোটি টাকা করা হয়েছে। উন্নয়ন বাজেটের মধ্যে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা দেশীয় উৎস থেকে এবং ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহ করা হবে। এছাড়া অনুদান হিসেবে ৫ হাজার কোটি টাকা পাওয়ার আশা করছে সরকার। আয় ও ব্যয়ের এই কাঠামোর ভিত্তিতে আগামী অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ২ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এটি চলতি অর্থবছরের তুলনায় ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি এবং সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বেশি।

বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার নির্ধারণ করা হতে পারে ৬৮ লাখ ৩১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২ লাখ ৪৪ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা, যা সংশোধন করে ৬১ লাখ ২১ হাজার ৯১০ কোটি টাকা করা হয়েছে।

সামষ্টিক অর্থনীতির সূচক অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় রাখতে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্য ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ।

কালের সমাজ/এএইচবি/এসআর

Link copied!