ঢাকা শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল, ২০২৬, ১৯ চৈত্র ১৪৩২

লামায় অবৈধ ইটভাটার‘রাজধানী’ ফাইতং ইউনিয়নে পুড়ছে বনের কাঠ

জেলা প্রতিনিধি, বান্দরবান | এপ্রিল ২, ২০২৬, ১০:৩৫ পিএম লামায় অবৈধ ইটভাটার‘রাজধানী’ ফাইতং ইউনিয়নে পুড়ছে বনের কাঠ

 স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব ইটভাটার মালিকদের অধিকাংশই বান্দরবানের বাসিন্দা নন। তারা ফাইতং এলাকার পরিবেশ ও জনজীবন ধ্বংস করে ইট উৎপাদন করলেও তার সুফল স্থানীয়রা পাচ্ছেন না।এদিকে ধুলাবালির প্রতিবাদে গত ১০ মার্চ  দুপুর ১২টার দিকে ফাইতং ইউনিয়ন পরিষদের পূর্ব পাশের সড়কের মাঝামাঝি স্থানে গাছ ফেলে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন শতাধিক স্থানীয় বাসিন্দা। 

এ সময় তারা সড়কে নিয়মিত পানি ছিটিয়ে ধুলো নিয়ন্ত্রণের দাবি জানান। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারিও দেন তারা।স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে সড়কটি বেহাল অবস্থায় থাকায় পুরো এলাকায় ধুলাবালির কারণে হাঁটা চলাচল যেমন কষ্টকর হয়ে পড়েছে, তেমনি বাড়িঘরে বসবাস করাও কঠিন হয়ে উঠেছে। ধুলার কারণে শিশু ও বৃদ্ধসহ অনেকেই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন।ফাইতংয়ের রাম্যখোলা এলাকায় নাজেমুল ইসলাম (নাজু কোম্পানি) নামে এক ব্যক্তিকে স্থানীয়রা ইটভাটা সিন্ডিকেটের প্রধান হিসেবে অভিযোগ করছেন। 

জনশ্রুতি রয়েছে, ফাসিয়াখালী ইউনিয়নসহ আশপাশ এলাকায় গড়ে ওঠা প্রায় ২৬টি ইটভাটার নিয়ন্ত্রণ তার হাতেই। তার মালিকানাধীন ডিবিএম (DBM) ইটভাটায় নোয়াখালী জেলার মাইজদী পশ্চিম গ্রামের ১২ বছরের জাকির তার বাবা আব্দুল বাতেনসহ শত শ্রমিক কাজ করছেন।এছাড়া এসএসবি (SSB) ইটভাটা নাজেমুল ইসলাম (নাজু), রিয়াদ ও রিংকুর যৌথ মালিকানায় পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে সেখানে চার রাউন্ড ইট প্রস্তুত করা হয়েছে এবং প্রতিটি রাউন্ডে প্রায় ৮ লাখ ইট পোড়ানো হয়। ফাইতং ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের শিবাতলী পাড়ায় আরিফ উদ্দিন ওরফে আরিফ কোম্পানির এবিসি–২ (ABC-2) নামের একটি ইটভাটা প্রায় ১৫ বছর ধরে চালু রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পাড়াবাসীকে জিম্মি করেই এই ইটভাটা পরিচালনা করা হচ্ছে।

শিবাতলী মারমা পাড়ার বাসিন্দা মংনুচিং মারমা (৩৪) বলেন, “আমাদের পাড়ায় প্রায় ৬৫টি পরিবার বসবাস করে। ইটভাটার ধোঁয়া ও ধুলাবালির কারণে সবজি ক্ষেত, গাছপালা, ঘরের টিনের চালা সব লালচে হয়ে গেছে। শিশুদের স্কুলে যাওয়া-আসার সময় ধুলাবালির কারণে তারা প্রায়ই সর্দি-কাশি ও জ্বরে আক্রান্ত হয়।” শিবাতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী উছাইওয়াং মারমা জানায়, পাড়া থেকে স্কুলে যাওয়ার পথে প্রচুর ধুলাবালির কারণে প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়তে হয়। জ্বর-সর্দি লেগেই থাকে, একই পাড়ার বাসিন্দা হাইসিং মং মারমা বলেন, “প্রায় ১৫ বছর ধরে ইটভাটার ধোঁয়া ও ধুলার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছি। গ্রীষ্মকালে ধুলাবালি, বর্ষায় কাদামাটি—এই রাস্তায় বছরের ৩৬৫ দিনই দুর্ভোগ পোহাতে হয়।”ফাইতংয়ের মংপ্রু থোয়াই মারমা পাড়া ও হরিন্যা খোলা রোয়াজা পাড়া এলাকায় প্রায় ৫০টি পরিবারের পাশে অবস্থিত টিএইচবি (THB) ইটভাটার মালিক মহি উদ্দিন। 

স্থানীয় বাসিন্দা অংনাই মারমা (২০) জানান, প্রায় ১৫–২০ বছর ধরে ইটভাটাটি চালু রয়েছে। ধুলাবালিতে আশপাশের গাছপালা ও টিনের ঘরগুলো পর্যন্ত হলদে হয়ে গেছে।অন্য দিকে ইউবিএম (UBM) ইটভাটার মালিক মো. কবির খানের ম্যানেজার মো. নুরুচ্ছফা দাবি করেন, তাদের ইটভাটা প্রশাসনের অনুমোদন নিয়েই পরিচালিত হচ্ছে। তবে ইটভাটার পাশে লুকানো অবস্থায় বিপুল পরিমাণ কাঠের স্তুপ দেখা গেছে।এদিকে ফাইতং ইউনিয়নের ইউবিএম–২ ইটভাটায় পাহাড় কাটার সময় হেলাল (২৮) নামে এক ডাম্পার চালকের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ভোর রাতে এ ঘটনা ঘটে। 

অভিযোগ রয়েছে, অবৈধভাবে পাহাড় ও মাটি কাটার সময় এ দুর্ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের মতে, এই মৃত্যু শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়; বরং অবৈধ পাহাড় কাটা, পরিবেশ ধ্বংস এবং শ্রমিক নিরাপত্তাহীনতার ভয়াবহ বাস্তবতার প্রতিফলন। অবৈধ ইটভাটা কার্যক্রম বন্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে আরও প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে বলে তারা মনে করছেন।স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে চলা এসব অবৈধ ইটভাটার কারণে ফাইতং ইউনিয়ন এখন অনেকের কাছেই “অবৈধ ইটভাটার রাজধানী” হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে বলে জানান তারা।

 

কালের সমাজ/ কে.পি

Link copied!