ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার সলিমগঞ্জ ইউনিয়নের বাড়াইল দাস পাড়ায় (হিন্দু পাড়া) গত রবিবার (১৪ জুন) রাতে সন্ত্রাসীদের হামলায় গুলিবিদ্ধ ও নিখোঁজ থাকা রিফাত (২৮) এর ক্ষতবিক্ষত লাশ অবশেষে উদ্ধার করেছে পুলিশ।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) বিকেলে নরসিংদীর করিমপুর মেঘনা নদী থেকে নরসিংদী সদর থানার করিমপুর নৌপুলিশ ওই লাশ উদ্ধার করে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে নরসিংদী সদর থানার ওসি এম আর আল মামুন রাতে বলেন,`মৃতের বোন সন্ধ্যায় এসে নিহত রিফাতকে তার `ভাই` হিসেবে সনাক্ত করেছে। এখন মরদেহের পোস্ট মর্টেম করার পর যথাযথ প্রক্রিয়া শেষে মৃতের পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হবে।`
এ বিষয়ে নিহত রিফাতের বোন মুক্তা বেগম রাতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে বলেন,`আমার নিহত ভাই রিফাতের শরীরে প্রচুর গুলিসহ তার গলা ও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ কেটে বর্বোরচিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা লাশ বাড়িতে নিয়ে দাফনের পর এ বিষয়ে মামলা করবো।`
মুক্তা বেগম আরও জনান, নিহত রিফাতের স্ত্রী ও ৩ মাস বয়সী একটি কন্যা সন্তান রয়েছে।
জানা গেছে, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও মাদক নিয়ন্ত্রণসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডের জের ধরে রবিবার (১৪ জুন) রাত আনুমানিক সাড়ে ১১ টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের বাড়াইল গ্রামের দাস পাড়ায় রিফাতের প্রতিপক্ষ মনেক ডাকাতের সশস্ত্র লোকজনের প্রচন্ড গোলাগুলিতে এক কনিকা দাস (৪০) নামের এক নারী আহত হন। তবে ওই গোলাগুলিতে `রিফাত` (২৮) `গুলিবিদ্ধ` হয় এবং সে নিহত হওয়ার পর তার লাশ `গুম` করা হয় বলে গত দুদিন ধরে এলাকায় ব্যাপক `গুঞ্জন` ছড়িয়ে পড়ে। যা ইতিমধ্যে ফেসবুকে রিফাতের ছবিসহ গুমের গল্প কাহিনীও ভাইরাল হয়।
এদিকে রবিবারের গোলাগুলির পেছনের ঘটনা কালের সমাজের পক্ষ থেকে অনুসন্ধান করে জানতে গেলে, পুলিশ ও এলাকার লোকজন জানান, নবীনগর উপজেলার ব্যবসা সমৃদ্ধ সলিমগঞ্জ ও বড়িকান্দি ইউনিয়ন দুটোর নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য, মাদক, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধের `সম্রাট` (পুলিশের তালিকায় মোস্ট ওয়ান্টেড) হিসেবে সুপরিচিত মন্নাফ মিয়া ওরফে মনেক ডাকাত। যার বিরুদ্ধে নবীনগর থানাসহ বিভিন্ন থানায় ৩০টিরও বেশী মামলা রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, এই দুর্ধর্ষ মনেক ডাকাতের বাড়ি সলিমগঞ্জের পাশ্ববর্তী বড়িকান্দি ইউনিয়নের নূরজাহানপুর গ্রামে।
অন্যদিকে মনেক ডাকাতের মূল প্রতিপক্ষ ছিলেন, পুলিশের এসপি পদ মর্যাদার এক কর্মকর্তার (যিনি এখন রাজশাহীতে কর্মরত) ছোট ভাই এমরান মাস্টার। এমরান মাস্টারের বাড়িও বড়িকান্দি ইউনিয়নের থোল্লাকান্দি গ্রামে।
জানা গেছে, কিছুদিন আগে মনেক বাহিনীর হামলায় গুলিতে গুরুতর আহত হয়ে এখন এসপির ভাই এমরান মাস্টার ঢাকায় চিকিৎসাধীন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক এলাকাবাসি জানান, এলাকার সবকিছু নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখাসহ আধিপত্য বিস্তার নিয়ে গত ১ নভেম্বর এমরান মাস্টারের বাহিনীর দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী খ্যাত এই রিফাতের গুলিতেই বড়িকান্দি গণিশাহ বাজারে মনেক ডাকাতের ছেলে একাধিক মামলার আসামি, এলাকার আরেক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী শিপন মিয়া (২৮) সহ দুজন নিহত হন।
সূত্র জানায়, ওই ঘটনার জের ধরে ও এলাকায় মাদক বিক্রিসহ নানা অপরাধের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে রাখতে এবার `মোস্ট ওয়ান্টেড` মনেক ডাকাতের দুই ছেলে সুমন ও নোমানের নেতৃত্বে মনেক বাহিনীর ২০/২৫ জন সশস্ত্র লোক গত রবিবার রাত আনুমানিক ১১ টার দিকে বাড়াইল দাস পাড়ায় (হিন্দু পাড়া) মাদক বিক্রেতা রিফাতের সমর্থক জনৈক সামিরের বাড়িতে অতর্কিতে গুলি করতে করতে হামলা চালায়। সেসময় রিফাত (২৮) সামিরের ঘরেই অবস্থান করছিলেন। গোলাগুলিতে রিফাত নিহত হওয়ার পর মনেক বাহিনী রিফাতের লাশ `গুম` করে বলে এলাকায় `গুঞ্জন` উঠে।
অবশেষে ২ দিন পর মঙ্গলবার নরসিংদীর করিমপুল এলাকায় মেঘনা নদী থেকে রিফাতের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ।
এ বিষয়ে মঙ্গলবার (১৬ জুন) রাতে নবীনগর থানার ওসি মোরশেদুল আলম চৌধুরী কালের সমাজ কে বলেন,`রিফাতের লাশ উদ্ধারের ঘটনাটি আমরাও শুনেছি। এখন নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে নবীনগর থানায় মামলা হলে, আমরা প্রযোজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেব।`
তবে তিনি জানান, যেই থানায় লাশ উদ্ধার হয়েছে, সেখানেও নিহতের পরিবার মামলা করতে পারবেন।`
কালের সমাজ/এসআর

