সিলেটের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের পাঠদানের জন্য প্রতিষ্ঠিত একটি সংবেদনশীল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চরম প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দিয়েছে| সিলেট ইনক্লুসিভ স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী শিক্ষিকা মোছাঃ আকলিমা বেগমের বিরুদ্ধে ওঠা একগুচ্ছ গুরুতর অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে জেলা শিক্ষা অফিস| তবে তদন্ত কমিটির সুপারিশ জমা পড়ার পর চার মাস পার হলেও জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন এখনো চূড়ান্ত কোনো পদক্ষেপ নেয়নি|
অভিযুক্ত এই শিক্ষিকার বিরুদ্ধে চাকুরির নিয়ম অমান্য করা, বিধি বহির্ভূতভাবে ছুটি কাটানো, প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই উচ্চশিক্ষা গ্রহণ, দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা এবং সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের মতো বেশ কিছু অভিযোগ উঠেছিল|
গত ২ জানুয়ারি সিলেটের জেলা প্রশাসক ও স্কুলের গভর্নিং বডির সভাপতির কাছে ৫ পাতার একটি বিশদ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন জেলা শিক্ষা অফিসার আবু সাঈদ মোঃ আব্দুল ওয়াদুদ| সেই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্ত শিক্ষিকার আচরণ `প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কিত বিশেষ শিক্ষা নীতিমালা-২০১৯`-এর ২৩ ধারার সম্পূর্ণ বিরোধী এবং এটি স্কুলের শিক্ষা পরিবেশ নষ্ট করছে| সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অটিজম আক্রান্ত ও এতিম শিশুদের সাথে তিনি অত্যন্ত আপত্তিকর আচরণ করেছেন বলে তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে|
এছাড়া, যথাযথ কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে এবং স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটিকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে তিনি জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনে সিনিয়র শিক্ষক পদের জন্য তদবির করেছিলেন, যা গত বছরের ২ অক্টোবর খারিজ হয়ে যায়| তার মাতৃত্বকালীন ছুটি নেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও তদন্তে আপত্তি তোলা হয়েছে|
তদন্তের ওপর ভিত্তি করে স্কুলের শিক্ষিকাকে অন্য কোথাও বদলি বা সংযুক্ত করার জোর সুপারিশ জানান সিলেটের জেলা প্রশাসক মোঃ সারওয়ার আলম| গত ২৫ ফেব্রুয়ারি তিনি জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে এই সংক্রান্ত চিঠি পাঠান| কিন্তু দুঃখজনকভাবে, বিগত চার মাসেও ওপর মহল থেকে কোনো দৃশ্যমান অ্যাকশন নেওয়া হয়নি|
স্কুল সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত শিক্ষিকা কয়েকজন পার্ট-টাইম শিক্ষককে সাথে নিয়ে প্রতিষ্ঠানে একটি নিজ¯বলয় ˆতরি করেছেন, যা স্কুলের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে| এই চক্রটি প্রধান শিক্ষক, জেলা প্রশাসন ও তদন্ত কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্য করে বিভিন্ন দপ্তরে উল্টো অভিযোগপত্র পাঠাচ্ছে| এমনকি তারা প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির দাবি তুলে বিভিন্ন জায়গায় আবেদনও করেছে| তবে স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানের সমস্ত আর্থিক লেনদেন জেলা প্রশাসক ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের যৌথ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়|
সিলেটের বাগবাড়ি এলাকায় অবস্থিত এই বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানটিতে অটিজম আক্রান্ত শিশুদের শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়, যেখানে শিক্ষকদের মানসিকতা ও পেশাদারিত্ব সবচেয়ে বেশি জরুরি|
উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং পড়াশোনার পরিবেশ বজায় রাখতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে জরুরি মনিটরিং সভা ডাকা হয়েছে| আকলিমা বেগমের সহযোগী তিন খণ্ডকালীন শিক্ষক—মোঃ মিনহাজুল ইসলাম, মোঃ রুহুল আমিন ও মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলামকে ইতিমধ্যে সতর্ক করা হয়েছে এবং তাদের একজনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছে|
এই প্রসঙ্গে প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষিকা ফারজানা ইশরাত জানান, বিশেষ শিশুদের এই স্কুলে নিয়মানুবর্তিতা বজায় রাখা জরুরি| তদন্তে সত্যতা মিলেছে এবং সুপারিশ পাঠানো হয়েছে, এখন বাকিটা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত| তবে পুরো বিষয়টি নিয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক ও জেলা শিক্ষা অফিসারের তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি|
কালের সমাজ/কে.পি

