ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট, ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
ইতিহাসের ত্রিমাত্রিক পাঠ

শিশুতোষ পপ-আপ বই "শহীদ জিয়ার গল্প শোন" ও "ছোটদের প্রিয় খালেদা জিয়া"

কালের সমাজ ডেস্ক | আগস্ট ৭, ২০২৬, ০৮:০৩ পিএম শিশুতোষ পপ-আপ বই

শিশুতোষ সাহিত্য কেবল বিনোদনের ক্ষেত্র নয়; এটি একটি সমাজের সাংস্কৃতিক স্মৃতি, জাতীয় পরিচয় ও মূল্যবোধ নির্মাণের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম। বিশেষ করে ইতিহাসভিত্তিক শিশুগ্রন্থ ভবিষ্যৎ নাগরিকের চেতনা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে ইতিহাসকে শিশুদের উপযোগী করে উপস্থাপন করা একটি জটিল নন্দনতাত্ত্বিক ও শিক্ষাতাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ। তথ্যের নির্ভুলতা, ভাষার সরলতা, কল্পনার বিস্তার এবং পাঠকের সক্রিয় অংশগ্রহনে একটি শিশুতোষ ইতিহাসগ্রন্থ প্রকৃত অর্থে সার্থক হয়ে ওঠে।

এই প্রেক্ষাপটে সাবরিনা শুভ্রা রচিত "শহীদ জিয়ার গল্প শোন" এবং "ছোটদের প্রিয় খালেদা জিয়া" বই দুটি বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।
বাংলা শিশু প্রকাশনার পরিসরে পপ-আপ বই এখনও একটি বিরল শিল্পমাধ্যম। এ ধরনের বই পাঠকে কেবল পাঠ্য অভিজ্ঞতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে না; বরং দৃশ্য, স্পর্শ ও গতিশীলতার সমন্বয়ে তাকে একটি বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বই দুটি বাংলা শিশু সাহিত্য ও প্রকাশনা শিল্পে একটি উদ্ভাবনী সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

বই দুটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ইতিহাসকে তথ্যনির্ভর বর্ণনার পরিবর্তে অভিজ্ঞতানির্ভর উপস্থাপনায় রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা। পৃষ্ঠা উন্মোচনের সঙ্গে সঙ্গে ত্রিমাত্রিক চিত্রের বিকাশ শিশু-পাঠকের মধ্যে বিস্ময়, কৌতূহল ও আবিষ্কারের আনন্দ সৃষ্টি করে। সমকালীন শিশু-মনোবিজ্ঞানের আলোচনায় দৃশ্যভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক শিক্ষার যে গুরুত্ব আরোপ করা হয়, বই দুটির নির্মাণশৈলী তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে পাঠ এখানে কেবল জ্ঞানার্জনের প্রক্রিয়া নয়; বরং একটি সক্রিয় শিক্ষানুভব।

স্বাধীনতার ঘোষক ও সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান এবং প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জীবন, নেতৃত্ব, দেশপ্রেম, রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং রাষ্ট্রগঠনে তাঁদের ভূমিকার নির্বাচিত দিকগুলো শিশুদের ভাষাগত ও মানসিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উপস্থাপন করা হয়েছে। জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতাকে পরিহার করে মূল ঘটনাগুলোকে সংক্ষিপ্ত, সুসংগঠিত ও সহজবোধ্য ভাষায় বিন্যস্ত করার প্রচেষ্টা শিশুতোষ রচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে।

পপ-আপের স্থাপত্য, রঙের ব্যবহার, অলংকরণ, টাইপোগ্রাফি এবং চিত্রবিন্যাস সম্মিলিতভাবে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পাঠ-পরিবেশ নির্মাণ করেছে। এখানে চিত্র কেবল লেখার অলংকার নয়; বরং বর্ণনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফলে দৃশ্য ও ভাষার মধ্যে একটি কার্যকর আন্তঃসম্পর্ক গড়ে উঠেছে, যা শিশু-পাঠকের গ্রহণক্ষমতাকে আরও সমৃদ্ধ করে।

বর্তমান ডিজিটাল বাস্তবতায় শিশুদের পাঠাভ্যাস নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এই প্রেক্ষাপটে পপ-আপ বইয়ের মতো আন্তঃক্রিয়ামূলক মুদ্রিত প্রকাশনা বইয়ের প্রতি শিশুদের আগ্রহ পুনর্জাগরণের একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। এ ধরনের প্রকাশনা দেখায় যে প্রযুক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতা না করে মুদ্রিত বইও নিজস্ব নন্দন ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে।

তবে ইতিহাসভিত্তিক শিশুগ্রন্থের কার্যকারিতা কেবল বইয়ের নন্দন বা নির্মাণশৈলীতে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বইকে ঘিরে যে প্রশ্ন, আলোচনা ও ব্যাখ্যার পরিবেশ তৈরি হয়, তার মধ্য দিয়েই ইতিহাস শিশুদের কাছে জীবন্ত ও অর্থবহ হয়ে ওঠে। সেই অর্থে এই বই দুটি একটি কার্যকর শিক্ষাসহায়ক উপকরণ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

সামগ্রিক মূল্যায়নে বলা যায়, "শহীদ জিয়ার গল্প শোন" এবং "ছোটদের প্রিয় খালেদা জিয়া" বাংলা শিশু সাহিত্যে বিষয়, নির্মাণ ও উপস্থাপনার দিক থেকে একটি তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন। শিশুতোষ ইতিহাসচর্চাকে দৃশ্যমান, অংশগ্রহণমূলক এবং অভিজ্ঞতাভিত্তিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে বই দুটি একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও ঐতিহ্যভিত্তিক আরও পপ-আপ গ্রন্থ প্রকাশিত হলে শিশু প্রকাশনার পরিসর যেমন সমৃদ্ধ হবে, তেমনি বিকশিত হবে শিশুদের অনুসন্ধিৎসা, নান্দনিক বোধ এবং ইতিহাসচেতনা।
বই দুটি প্রকাশ করেছে দশমিক প্রকাশনী।

কালের সমাজ/কে.পি

গ্রাম-গঞ্জ বিভাগের আরো খবর

Link copied!