ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট, ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

মনপুরায় হাজার কোটি টাকার বেড়িবাঁধে ধস, আতঙ্কে দেড় লাখ মানুষ

কালের সমাজ ডেস্ক | আগস্ট ৭, ২০২৬, ০৭:৩৬ পিএম মনপুরায় হাজার কোটি টাকার বেড়িবাঁধে ধস, আতঙ্কে দেড় লাখ মানুষ

ভোলার মনপুরায় উপকূল রক্ষায় প্রায় ১ হাজার ১৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন টেকসই বেড়িবাঁধের বিভিন্ন স্থানে ধস ও বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই বাঁধের মাটি ও বালু সরে যাওয়ায় আতঙ্কে রয়েছেন উপজেলার উপকূলীয় এলাকার প্রায় দেড় লাখ বাসিন্দা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নমানের বালু ব্যবহার এবং নির্মাণকাজে যথাযথ তদারকির অভাবে কাজ শেষ হওয়ার আগেই বাঁধের বিভিন্ন অংশ ধসে পড়ছে।
স্থানীয় সূত্র ও সরেজমিনে দেখা গেছে, মনপুরা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম পাশ, হাজিরহাট ইউনিয়নের ২, ৩ ও ৮ নং ওয়ার্ড এবং দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের সূর্যমুখী এলাকায় নির্মাণাধীন বেড়িবাঁধের বিভিন্ন অংশে ধস নেমেছে। কোথাও বাঁধের বালু সরে গিয়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। ধসে পড়া বাঁধের বালুতে কয়েকটি কৃষকের আমন ধানক্ষেতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সর্বশেষ গত মঙ্গল ও বুধবার টানা বৃষ্টির পর হাজিরহাট ইউনিয়নের ২ ও ৩ নং ওয়ার্ডের পশ্চিম পাশের নির্মাণাধীন বেড়িবাঁধের একটি অংশ ধসে পড়ে। এতে এক কৃষকের আমন ধানের ক্ষেতের একটি বড় অংশ ধসে পড়া বালুতে নষ্ট হয়ে যায়।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ‘ভোলা জেলার মুজিবনগর ও মনপুরা উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসন, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও তীর সংরক্ষণ’ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের আওতায় ৫০ দশমিক ৭০০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও সংশ্লিষ্ট কাজ করার কথা রয়েছে। এর জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। প্রকল্পের কাজ টেন্ডারের মাধ্যমে ছয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পেয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরা সরাসরি কাজ না করে সাবঠিকাদারের মাধ্যমে নির্মাণকাজ করাচ্ছে। ফলে কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাদের দাবি, মেঘনা নদী থেকে নিম্নমানের বালু এনে বাঁধ নির্মাণে ব্যবহার করায় বৃষ্টির পানিতে সহজেই বাঁধের মাটি ও বালু সরে যাচ্ছে।

হাজিরহাট এলাকার সোনারচর ২ নং ওয়ার্ডের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক বাপ্পীসহ স্থানীয়রা বলেন, বাঁধ নির্মাণে নিম্নমানের বালু ব্যবহার করা হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টিতেই বাঁধ ধসে পড়ছে। ধসে পড়া বালুতে তাদের আমন ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মেহেদী হাসান, ইলিয়াস, রাকিব ও বনি আমিন বলেন, নির্মাণাধীন বাঁধে বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত তৈরি হওয়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। তারা জানান, গত বছর বাঁধ নির্মাণের অনিয়মের প্রতিবাদ করতে গিয়ে ছাত্রদল নেতা রাশেদ নিহত হন। একই বছর মনপুরা ইউনিয়নের রামনেওয়াজ এলাকায় নির্মাণাধীন বেড়িবাঁধের গর্তে পড়ে ১০ বছরের এক শিশু মারা যায় বলেও তারা দাবি করেন।

তাদের আশঙ্কা, বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার আগেই যদি এভাবে ধস ও গর্ত তৈরি হয়, তাহলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা নদীর প্রবল স্রোতের সময় বাঁধ বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। এতে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে প্রাণহানি ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে ধসে পড়া অংশে ইতোমধ্যে ভেকু মেশিন দিয়ে মেরামতের কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী মো. তুহিন। তিনি বলেন, পাউবোর প্রকৌশলীদের তদারকির মধ্যেই নিয়ম মেনে কাজ করা হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডিভিশন-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসফাউদদৌলা বলেন, বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি। অতিবৃষ্টির কারণে কয়েকটি স্থানে গর্ত ও ধসের সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত মেরামতের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই সংস্কারকাজ শুরু হবে।

তবে বিপুল অর্থের এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিভিন্ন স্থানে ধস ও গর্তের ঘটনায় নির্মাণকাজের মান, তদারকি এবং ব্যবহৃত উপকরণের মান নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন উপকূলবাসী।

কালের সমাজ/কে.পি

গ্রাম-গঞ্জ বিভাগের আরো খবর

Link copied!