শরতের প—ন্ত বিকেলে শান্ত নবগঙ্গা নদী সেজেছিল এক ভিন্ন রূপে। নদীর শান্ত জলে বৈঠার তালে উঠেছিল ঢেউয়ের খেলা; ‘ছলাৎ ছলাৎ’ শব্দ তুলে ছুটে চলে বাইচের নৌকা। হেলদুলে একতালে বৈঠা টেনে উৎসবের রঙ ছড়িয়ে দেয় বাইচাররা। চড়ন্দারের ঘন্টির টং টং আওয়াজ আর মাঝির অভিজ্ঞ হাতে হাল ধরে নৌকার নিয়ন্ত্রণ নেয়ার কসরত এক মনোরম দৃশ্যের সৃষ্টি করে।
মাগুরা সদর উপজেলার বেরইল-পলিতা এলাকায় নবগঙ্গা নদীতে গত বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে অনুষ্ঠিত হয় গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা। মেঘ-রৌদ্রের লুকোচুরি আর শরতের নীল আকাশের নিচে আয়োাজিত এই নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা উপভোগ করতে নবগঙ্গার দুই তীরে যেন আছড়ে পড়েছিল আনন্দ-উচ্ছ্বাস আর উৎসেবর জোয়ার। হাজার হাজার উৎফুল্ল মানুষের কোলাহলে পুরো এলাকা হয়ে উঠেছিল অনন্য মিলনমেলা। বেরইল-পলিতা নৌকাবাইচ মেলা কমিটি ও স্থানীয় এলাকাবাসীর যৌথ উদ্যোগে এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।
দুপুরের পর থেকেই নানা বয়সী ও শ্রেণিপেশার মানুষ জড়ো হতে থাকেন নবগঙ্গা পাড়ে। প্রতিযোগিতা শুরুর অনেক আগেই নদীর দুই কূল দর্শক সমাগমে পূর্ণ হয়ে যায়। দূর-দূরান্ত থেকে আসা আমুদে দর্শকরা নৌকাবাইচ উপভোগ করতে নদীর দুই পাড়ে. উঁচু বাঁধে এবং বেরইল-পলিতা সেতুর ওপর ভিড় জমান। কাঙ্খিত নৌকাবাইচ শুরু হয় বিকেল সাড়ে তিনটায়। আগত দর্শকরা হৈ-হুল্লোড়, আনন্দ-উচ্ছ্বাস আর উৎসবমুখর পরিবেশে উপভোগ করেন চিরায়াত বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিযোগিতা। উৎসবের আমেজে অনেকেইে দলবদ্ধবাবে ছোট নৌকা নিয়ে নদীর বুকেও ঘুরছিলেন।
নৌকাবাইচকে ঘিরে বেরইল-পলিতা বাজার সংলগ্ন মাঠে বসেছিল বর্ণাঢ্য গ্রামীণ মেলা। মেলায় হরেক রকমের মিষ্টি, বাহারি খাবার, মাটির ও কাঠের তৈরি খেলনা, গ্রামীণ হস্তশিল্প এবং গৃহস্থালি নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানিরা। ছিল নাগরদোলাসহ বিনোদনের বিভিন্ন রকম ব্যাবস্থা। বাইচের আনন্দের পাশাপাশি মেলাও মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে।
স্থানীয়রা জানান, আধুনিক বিনোদনের প্রভাবে বাংলার নদীকেন্দ্রিক এমন লোকজ ঐতিহ্য আজ প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। এক সময় বর্ষার মৌসুমে নৌকাবাইচ ছিল অন্যতম একটি আনন্দ উৎসব। নবগঙ্গার বুকে এমন আয়োজন নতুন প্রজন্মের সামনে বাংলার সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। এমন আয়োজন প্রতিবছর হলে তা এই অঞ্চলের একটি স্থায়ী উৎসবে রূপ নেবে বলে প্রত্যাশা আয়োজক ও স্থানীয় সচেতন মহলের।
আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, গ্রামীণ ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে এবং মানুষের পারস্পরিক সামাজিক বন্ধন আরও সুদৃঢ় করতে এই আয়োজন করা হয়েছে।
কালের সমাজ/কে.পি

