মাথার ওপর ঝুলছে পল্লী বিদ্যুতের তার, সারিবদ্ধভাবে পোঁতা রয়েছে খুঁটি। বসতঘর কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুবিন্যস্ত ওয়ারিং, ফিটিং করা আছে লাইট-ফ্যানও। কোনো কোনো ঘরে শোভা পাচ্ছে পানির মোটর। কিন্তু এসবের মাঝে কেবল অনুপস্থিত বহু কাঙ্ক্ষিত বিদ্যুৎ। দেখতে দেখতে পার হয়ে গেছে আটটি বছর, অথচ একটি বাতিও জ্বলেনি এই বিদ্যুৎ অবকাঠামোর।
নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চার গ্রামে চলছে এই অদ্ভুত ও মর্মান্তিক চিত্র। চর নোমান, চর আক্রাম উদ্দিন, চরলক্ষ্মী ও চর উরিয়া—এই চার গ্রামের প্রায় তিন হাজার পরিবার এখন বিদ্যুতের আলো পাওয়ার আকুল অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের দিকে বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়ার আশায় এলাকার বাসিন্দারা নিজ খরচে ঘরে ঘরে ওয়ারিং করান এবং মিটার বোর্ড বসান। অনেকেই জমানো টাকা দিয়ে লাইট, ফ্যানসহ প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কিনে প্রস্তুত রাখেন। কিন্তু দীর্ঘ আট বছর ধরে সংযোগ না আসায় এসব অন অব্যবহৃত পড়ে থেকে নষ্ট হতে বসেছে। মিটার বোর্ডে ধরেছে মরিচা। অন্যদিকে সংযোগহীন অবস্থায় বছরের পর বছর পড়ে থাকায় বাইরে টানা বৈদুতিক তারের স্তূপে জঙ্গল গজিয়েছে, কোনো কোনো স্থানে খুঁটির চারপাশে জমেছে আগাছার স্তূপ।
শুধু বসতবাড়িই নয়, এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থাও একই। শ্রেণিকক্ষে লাইট ও ফ্যান ঝুললেও বিদ্যুৎ না থাকায় গরমে মারাত্মক দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। সন্ধ্যার পর গ্রামগুলোতে নেমে আসে তীব্র অন্ধকার, বিঘ্নিত হচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা।
এলাকাবাসীর চরম ক্ষোভ ও প্রশ্ন—বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য প্রয়োজনীয় সব অবকাঠামো যখন প্রস্তুতই ছিল, তখন আটটি বছর ধরে একটি লাইন চালু করতে পারল না কেন পল্লী বিদ্যুৎ? স্থানীয়দের অভিযোগ, সে সময় বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার নাম করে তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাবশালী একটি চক্র তাঁদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেয়। তবে এসব আর্থিক লেনদেনের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
দীর্ঘদিনেও সংযোগ চালু না হওয়ার বিষয়ে জানতে নোয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেলা সদর দপ্তরে যাওয়া হলে সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) মকবুল আলম ক্যামেরার সামনে বা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
তবে বিষয়টি সম্পর্কে নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম জানান, ঘটনাটি খতিয়ে দেখে খুব দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সরকারের বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগের পর আট বছর ধরে এই অবকাঠামো পরিত্যক্ত পড়ে থাকায় রাষ্ট্রীয় সম্পদের যেমন অপচয় হচ্ছে, তেমনি নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে পিছিয়ে পড়ছে চরাঞ্চলের প্রায় তিন হাজার পরিবার। কারণ চিহ্নিত করে অনতিবিলম্বে বিদ্যুৎ লাইনটি চালু করে চরাঞ্চলবাসীর দীর্ঘদিনের অন্ধকার দূর করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।
কালের সমাজ/কে.পি

