রাজধানী ঢাকার গণপরিবহণে শৃঙ্খলা ফেরাতে বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিদ্যমান বাস রুটগুলো পুনর্বিন্যাস করে মহানগরীর ৩২টি রুটে চালু করা হবে ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা। প্রাথমিকভাবে আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে দুটি রুটে এ ব্যবস্থা চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ছয় মাসের মধ্যে পুরো কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় বাস রুট পুনর্বিন্যাস, নির্দিষ্ট স্টপেজ, ই-টিকিটিং, জিপিএস ট্র্যাকার এবং পুরোনো বাসের মান উন্নয়নসহ গণপরিবহণ ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
এক কোম্পানির অধীনে চলবে এক রুটের বাস
সভায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় অনুমোদিত ৪১৮টি বাস রুটের মধ্যে বর্তমানে সচল রয়েছে ৯৮টি। এসব রুটে বিভিন্ন পরিবহণ কোম্পানির পাশাপাশি ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস চলাচল করে। রুটের পুনরাবৃত্তি ও যাত্রী ওঠানোর প্রতিযোগিতার কারণে সড়কে বিশৃঙ্খলা, যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান রুটগুলো সমন্বয় করে ৩২টি রুটে রূপান্তরের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত রুটগুলোর প্রায় ৭০ শতাংশ বর্তমান রুটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
নতুন ব্যবস্থায় প্রতিটি রুটে নির্দিষ্ট একটি কোম্পানির বাস চলবে। বাসের ফিটনেস, চালকদের আচরণ, সড়কে শৃঙ্খলা এবং পরিবহণ আইন মেনে চলার দায়িত্বও থাকবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির ওপর। এতে বাস পরিচালনায় জবাবদিহি বাড়বে বলে আশা করছে সরকার।
নির্দিষ্ট স্টপেজ, ই-টিকিটিং ও জিপিএস
যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা বন্ধ করতে নির্দিষ্ট বাস স্টপেজ নির্মাণ ও সংস্কারের সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রয়োজনীয় উন্নয়নকাজের বিবরণসহ স্টপেজের তালিকা ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে পাঠানো হবে। তিন মাসের মধ্যে এসব স্টপেজের নির্মাণ ও সংস্কারকাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
যাত্রীদের সুবিধার্থে স্টপেজগুলোতে ছাউনি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি কাউন্টারভিত্তিক টিকিটের পাশাপাশি ই-টিকিটিং চালু এবং প্রতিটি বাসে জিপিএস ট্র্যাকার স্থাপন বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে বাসের অবস্থান পর্যবেক্ষণ এবং যাত্রীসেবার মান উন্নত করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পুরোনো বাস মেরামতে দুই মাস সময়
রাজধানীতে চলাচলকারী ফিটনেসবিহীন, মেয়াদোত্তীর্ণ ও জরাজীর্ণ বাসের বিষয়েও সভায় আলোচনা হয়। এসব বাসের যান্ত্রিক মেরামত এবং ডেন্টিং-পেইন্টিংয়ের জন্য মালিকদের দুই মাস সময় দেওয়া হয়েছে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মেরামত না করলে সংশ্লিষ্ট বাস চলাচল করতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে আইনানুগ ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।
ডাম্পিং স্টেশনে থাকা ৩৬ হাজার যানবাহন নিয়ে উদ্যোগ
বিভিন্ন মামলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জব্দ করা প্রায় ৩৬ হাজার যানবাহন ডাম্পিং স্টেশনে পড়ে রয়েছে। এসব যানবাহন দ্রুত নিলাম বা অন্য আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
আট রুটে চলতে পারে বিআরটিসির বৈদ্যুতিক বাস
রাজধানীর গণপরিবহণে বৈদ্যুতিক বাস চালুর বিষয়টিও সভায় গুরুত্ব পেয়েছে। প্রাথমিকভাবে ঢাকার আটটি রুটে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ করপোরেশনের (বিআরটিসি) বৈদ্যুতিক বাস চালানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে ঢাকা পরিবহণ সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ), বিআরটিসি ও বাস মালিক সমিতির সঙ্গে আলোচনা করে রুট চূড়ান্ত করা হবে।
সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সংস্থাগুলোকে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে ছয় মাসের সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক বিভাগে জমা দিতে বলা হয়েছে। ২০২৭ সালের ১৫ এপ্রিলের মধ্যে এসব উদ্যোগের দৃশ্যমান ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে ঢাকার বাস চলাচলে বিশৃঙ্খলা কমানো, যাত্রীসেবার মান বাড়ানো এবং গণপরিবহণ ব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কালের সমাজ/কে.পি

