গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তায় শ্রমিক আন্দোলনে আহত হয়ে নিহত পোশাকশ্রমিক তৌফিক শেখের স্মরণে আয়োজিত গায়েবানা জানাজায় সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে। বুধবার (৪ নভেম্বর) দুপুরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও দলটির সহযোগী সংগঠন শ্রমিক শক্তির উদ্যোগে নিহত শ্রমিকের আত্মার মাগফিরাত কামনায় এ গায়েবানা জানাজার আয়োজন করা হয়। তবে জানাজা শুরু করার আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বাধা দেন। একপর্যায়ে সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে উপস্থিত নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়।
নিহত তৌফিক শেখ গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কোচাশহর ইউনিয়নের ছয়ঘরিয়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি গাজীপুরের বাংলাবাজার এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন এবং স্থানীয় লায়লা স্টাইলস লিমিটেড পোশাক কারখানার কাটিং বিভাগে জুনিয়র লে-ম্যান হিসেবে কাজ করতেন।
পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে গাজীপুরে চলমান আন্দোলনের মধ্যে সোমবার (২ নভেম্বর) হামলার শিকার হন তৌফিক। ওই ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর তাকে ঢাকার উত্তরার শিন শিন জাপান হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দুপুরে তার মৃত্যু হয়।
পরিবারের সদস্যদের বরাতে জানা গেছে, আন্দোলনের সময় হামলার ঘটনা মোবাইল ফোনে ধারণ করার চেষ্টা করলে তৌফিকের ওপর হামলা করা হয়। পরে আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
তৌফিকের মরদেহ মঙ্গলবার রাতে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ছয়ঘরিয়া গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে স্থানীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
তার মৃত্যুতে পরিবার, স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে।
তৌফিকের মৃত্যুর পর তার আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির প্রতি সংহতি জানাতে বুধবার দুপুরে গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তায় গায়েবানা জানাজার আয়োজন করে এনসিপি।
কর্মসূচিতে এনসিপি ও শ্রমিক শক্তির কয়েকজন নেতা বক্তব্য দেন। পরে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট আলী নাসের খান বক্তব্য শেষ করে জানাজা শুরু করতে চাইলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বাধা দেন।
এ সময় উপস্থিত নেতাকর্মীরা জানাজা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে জমায়েত ছত্রভঙ্গ করে দেন বলে অভিযোগ করেছেন দলটির নেতারা।
এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা আলী নাসের খান অভিযোগ করে বলেন, তারা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে নিহত শ্রমিকের বিচার দাবি এবং তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করতে চেয়েছিলেন। একই সঙ্গে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি মেনে নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছিলেন।
তিনি দাবি করেন, গায়েবানা জানাজা পড়তে না দিয়ে তাদের ওপর হামলা করা হয়েছে।
এনসিপির নেতাদের দাবি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ ও ধাক্কাধাক্কিতে তাদের ২০ জনের বেশি নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে জাতীয় শ্রমিক শক্তির আহ্বায়ক মাজহার ফকির, গাজীপুর জেলা এনসিপির সদস্যসচিব আবুল কাশের মাস্টারসহ দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা রয়েছেন।
এ ঘটনায় গাজীপুর শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চান্দনা চৌরাস্তায় এনসিপির নেতাকর্মীরা সড়ক অবরোধ করে গায়েবানা জানাজার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তাদের সড়ক থেকে সরে যেতে বলা হলেও তারা নির্দেশনা মানেননি। এতে যান চলাচল ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি জটিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলে সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, এনসিপির নেতারা বলছেন, তারা শান্তিপূর্ণভাবে জানাজা ও দোয়ার আয়োজন করেছিলেন। তাদের কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া এবং সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত।
শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান
গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলনের মধ্যে তৌফিকের মৃত্যু নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান বাজারদর, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়ের তুলনায় তাদের মজুরি অপর্যাপ্ত।
এদিকে শ্রমিকদের আন্দোলন, সংঘর্ষ ও কারখানা বন্ধের ঘটনায় শিল্পাঞ্চলের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি বাস্তবায়ন এবং শিল্পকারখানার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
নিহত শ্রমিক তৌফিকের মৃত্যুর ঘটনায় বিচার দাবি করেছে এনসিপি। একই সঙ্গে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসা এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে দলটি।
কালের সমাজ/কে.পি

