যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জন্য ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রীয় জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে ইরান। আর সেখানে ইরানি জনগণের বিপুল সমাবেশ ঘটিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি চ্যালেঞ্জের বার্তা দিচ্ছে তেহরান।
দুটি দেশের পাঁচটি শহরজুড়ে ছয় দিনব্যাপী বিশাল এই শোকানুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান লিখেছে, এসব কর্মসূচিতে সব মিলিয়ে এক থেকে দুই কোটি মানুষের অংশগ্রহণ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবফ জনগণকে ব্যাপকভাবে জানাজায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, এই উপস্থিতিই হবে দেশের প্রতিশোধের বার্তা এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতি সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ।
সিএনএন লিখেছে, বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দুটি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে একটি ব্যয়বহুল যুদ্ধ এবং কয়েক দশকের তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও তেহরান খামেনির বিদায় অনুষ্ঠানে কোনো কমতি রাখছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবসের সমান্তরালে বিশাল এ শোকের আয়োজন করে বিশ্বমঞ্চ ও শত্রুদের, বিশেষ করে ডনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের অজেয় থাকার একটি কড়া বার্তা দিতে চাইছে তারা।
এই বিশাল আয়োজন শুধু শোক প্রকাশের জন্য নয়; বরং সাম্প্রতিক যুদ্ধ, নেতৃত্ব পরিবর্তন এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের মধ্যে রাষ্ট্রীয় ঐক্য ও স্থিতিশীলতার বার্তা দেওয়ার চেষ্টা।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, খামেনির কফিন তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়েছে। অনুষ্ঠান ঘিরে রাজধানীতে কঠোর নিরাপত্তা, সড়ক নিয়ন্ত্রণ এবং আকাশসীমায় বিশেষ বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
এ কর্মসূচির মূল আনুষ্ঠানিকতা শনিবার শুরু হলেও তেহরানের রাস্তায় রাস্তায় এরই মধ্যে সাধারণ মানুষকে শোক প্রকাশ করতে যাচ্ছে।
কোমের মসজিদের খতিব আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ সাইদি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেন, “শহীদ নেতা এবং অন্য শহীদদের জানাজায় জনগণের এই বিশাল উপস্থিতি কার্যত ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পক্ষে আরেকটি গণভোট হিসেবে গণ্য হবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত হন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। জবাবে ইসরায়েল এবং প্রতিবেশী অন্যান্য দেশে মার্কিন স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালায় ইরান।
এরপর সেই যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে পুরো পশ্চিম এশিয়ায়, জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে পুরো বিশ্বে তার প্রভাব পড়ে।
খামেনির ছেলে মুজতাবাকে খামেনিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করা হয়। তবে বাবার সঙ্গে একই হামলায় গুরুতর আহত হওয়া মুজতাবাকে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে নতুন কোনো ছবিতে দেখা যায়নি।
মুজতাবা তার বাবার শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেবেন না বলেই জানিয়েছেন ভারতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি আয়াতুল্লাহ হাকিম এলাহি।
তিনি বলেন, মুজতাবা খামেনি ব্যক্তিগতভাবে বাবার জানাজায় যাওয়া এবং শোকার্ত মানুষের মাঝে সামিল হতে চাইলেও তার নিরাপত্তার দিক বিবেচনা সে সম্ভাবনা খুবই কম।
এলাহি জানান, মুজতাবা খামেনির ঘনিষ্ঠজনরা এই আভাস দিয়েছেন যে তিনি বাইরে বেরোতে চান এবং সমর্থকদের সঙ্গেও দেখা করতে চান। কিন্তু নিরাপত্তা সংস্থাগুলো তাকে তা না করারই পরামর্শ দিয়েছে।
এদিকে, শিয়া মুসলমানদের দ্বাদশ ইমামের (যিনি নবম শতাব্দীতে নিখোঁজ হয়েছিলেন) প্রতিনিধি খামেনির এই মৃত্যুকে শিয়া শাহাদাত ও শোকের ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন তার সমর্থকরা।
সিএনএন লিখেছে, শুক্রবার রাশিয়া ও চীনসহ বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তা ও বিদেশি প্রতিনিধিরা এই শোক প্রকাশ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তেহরানে পৌঁছাবেন।
শনি ও রোববার ইমাম খোমেনি মুসাল্লায় বিদায় অনুষ্ঠান হবে, এর মধ্যে প্রথম দিন জানাজার কর্মসূচি রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন।
সোমবার তেহরানে হবে প্রধান শোকযাত্রা। এ সময় খামেনির কফিনের পাশাপাশি একই হামলায় নিহত তার মেয়ে, জামাতা ও পুত্রবধূ (বর্তমান সর্বোচ্চ নেতার স্ত্রী) ও নাতনির মরদেহ বহন করা হবে।
শোকযাত্রার পর প্রয়াত নেতার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে ইরানের শিয়া ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রধান কেন্দ্র ও ধর্মীয় শিক্ষানগরী কোমে, যেখানে মঙ্গলবার জানাজা ও শোক অনুষ্ঠান হবে।
এরপর বুধবার খামেনির কফিন নেওয়া হবে প্রতিবেশী দেশ ইরাকে। সেখানকার নাজাফ ও কারবালা শহরে শোকযাত্রা ও জানাজা হবে। ইরানের সমমনা ও মিত্র শিয়া গোষ্ঠীগুলোর শীর্ষস্থানীয় নেতারা উপস্থিত থাকবেন সেখানে।
এরপর বৃহস্পতিবার ইরানের মাশহাদ শহরে আরেকটি শোভাযাত্রার পর হযরত ইমাম রেজার মাজারে দাফন করা হবে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে।
এসব আয়োজনে যত বেশি সম্ভব মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হোটেলগুলোতে ৫০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হয়েছে। স্কুল, মসজিদ ও স্পোর্টস হলগুলোকে শোকগ্রস্ত মানুষদের আবাসন হিসেবে প্রস্তুত করা হয়েছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে তেহরানসহ অন্যান্য শহরের আকাশসীমায় সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল নতুন কোনও হামলা চালালে কঠোর জবাবের হুমকি দেওয়া হয়েছে।
তেহরানে খামেনির পোস্টারের নিচে দাঁড়িয়ে ১৯৮০-৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের ৬৩ বছর বয়সী প্রবীণ যোদ্ধা হোসেন খেইরি বলেন, “আমরা আমাদের নিজস্ব উপায়ে আমেরিকা ও অন্যদের কাছে আমাদের শক্তি প্রদর্শন করছি।”
আর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সাম্প্রতিক শান্তি আলোচনার নেতৃত্ব দেওয়া স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবফ বলেন, “আমাদের অবশ্যই জেগে উঠতে হবে এবং বিশ্ববাসীর কাছে এই রক্তের দাবি তুলতে হবে, যেন বিশ্ব জানতে পারে যে ইরানের সম্মানিত ও মহৎ জাতি নিপীড়নের মুখে নীরব থাকে না।
এটি একটি মহাকাব্যিক কীর্তি যা বিশ্বের কাছে একটি জাতির আত্মার মহানুভবতা প্রদর্শন করবে।
কালের সমাজ/এএইচবি

