জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ইউরোপে এবারের গ্রীষ্ম প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রার কারণে ইউরোপের ৮৫৪টি শহরে ৫০ হাজারের বেশি মানুষের অকালমৃত্যু হয়েছে। গবেষকদের হিসাবে, এসব মৃত্যুর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন।
নেচার হেলথ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন ও লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের বিজ্ঞানীরা গবেষণাটি পরিচালনা করেন।
গবেষণায় ইউরোপের ৩০টি দেশের শহরাঞ্চলের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব এলাকায় প্রায় ১৭ কোটি ৩০ লাখ মানুষ বসবাস করেন। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, শুধু মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এবারের গ্রীষ্মে অতিরিক্ত ৩২ হাজার ৬১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, গত বছরের তুলনায় এবার তাপপ্রবাহে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। এমনকি ২০০৩ ও ২০২২ সালের ভয়াবহ তাপপ্রবাহের তুলনায়ও এবার তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ৭০ শতাংশের বেশি।
গবেষকদের মতে, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন বাড়ছে। এতে বৈশ্বিক উষ্ণতা তীব্র হওয়ার পাশাপাশি তাপপ্রবাহের স্থায়িত্ব ও তীব্রতা বাড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্যের ওপর।
দেশভিত্তিক হিসাবে, ইউরোপে তাপজনিত অকালমৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ইতালিতে। দেশটিতে এ ধরনের মৃত্যুর সংখ্যা ১৩ হাজার ৩০৩। এরপর ফ্রান্সে ৭ হাজার ২৬৮, স্পেনে ৬ হাজার ৮২৪ এবং জার্মানিতে ৬ হাজার ৩৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
যুক্তরাজ্যে তাপপ্রবাহের কারণে আনুমানিক ৪ হাজার ৩৫৪ জনের অকালমৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৫৩৫টি মৃত্যুর জন্য মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করেছেন গবেষকেরা।
গবেষণায় আয়ারল্যান্ডের শহরাঞ্চলেও তাপপ্রবাহের প্রভাব উঠে এসেছে। দেশটির শহরাঞ্চলে গ্রীষ্মের তিন মাসে উচ্চ তাপমাত্রার কারণে আনুমানিক ৬০ জনের অকালমৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৫টি মৃত্যুর জন্য দায়ী মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন। তবে এই হিসাব শুধু শহরাঞ্চলের তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে, পুরো দেশের নয়।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম ইউরোপে এবারের গ্রীষ্মে তাপমাত্রা ১৯৯১ থেকে ২০২০ সালের গড়ের তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। কোনো কোনো দিনে কয়েকটি দেশে তাপমাত্রা ঐতিহাসিক গড়ের চেয়ে ১২ ডিগ্রি পর্যন্ত বেড়েছিল।
গত ১৭ জুন থেকে ১ জুলাই পর্যন্ত তীব্র তাপপ্রবাহের সময় গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত শহরগুলোতে গ্রীষ্মের মোট তাপজনিত মৃত্যুর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঘটে। ওই সময়ে গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৫ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের জলবায়ু গবেষক ডক্টর ক্লেয়ার বার্নস বলেন, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এসব পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু এবং স্বজন হারানোর বেদনা।
গবেষণায় দেখা গেছে, তাপজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন বয়স্ক ব্যক্তিরা। তবে কম বয়সীরাও এ ঝুঁকির বাইরে নন।
গবেষকদের হিসাবে, এবারের গ্রীষ্মে তাপজনিত কারণে ৬৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ৬ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, ৮৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে মারা গেছেন আনুমানিক ২২ হাজার ৫০২ জন, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৪৫ শতাংশ।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, ২০০০ সালের শুরুর দিকে তাপজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের অবদান ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ। ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে তা বেড়ে ৬৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের সহকারী অধ্যাপক ডক্টর পিয়ের ম্যাসেলো বলেন, চরম তাপপ্রবাহ এখন আর শুধু ইউরোপের উষ্ণ অঞ্চলগুলোতে সীমাবদ্ধ নেই। পশ্চিম ও উত্তর ইউরোপের বিভিন্ন এলাকাও তীব্র গরম ও স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছে।
তিনি বলেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে ইউরোপের শহরগুলোকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ জন্য শহরকে শীতল রাখার ব্যবস্থা, সবুজ এলাকার পরিমাণ বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, ভবিষ্যতে তাপমাত্রা আরও বৃদ্ধি ঠেকাতে গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন দ্রুত কমাতে হবে। একই সঙ্গে বয়স্ক ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
গবেষণায় শুধু শহরাঞ্চলের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে ইউরোপজুড়ে তাপজনিত মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করছেন গবেষকেরা।
কালের সমাজ/কে.পি

