ফ্রান্সে বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের পর নতুন কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। আগামী ২৪ অক্টোবর ‘অ্যাক্ট টু’ নামে আরেক দফা বিক্ষোভের প্রস্তুতি চলছে। একই সঙ্গে আগামী ২০ নভেম্বর ইউরোপজুড়ে সমন্বিত যুব ধর্মঘটেরও আহ্বান জানিয়েছে বামপন্থী ও সমাজতান্ত্রিক বিভিন্ন সংগঠন। এসব কর্মসূচির পেছনে যুক্তরাষ্ট্রসহ ১৩টি দেশে বিস্তৃত ১০১টি সংগঠনের নেটওয়ার্ক রয়েছে বলে দাবি করেছে ফক্স নিউজ ডিজিটাল।
ফক্স নিউজের ২০ অক্টোবর প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্সের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে আগে ৫৪টি সংগঠনের সম্পৃক্ততার কথা উঠে এলেও নতুন অনুসন্ধানে ১০১টি সংগঠনের নাম পাওয়া গেছে। এসব সংগঠনের মধ্যে ৩৩টি মূলত শিক্ষার্থী ও তরুণদের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই নেটওয়ার্কে কমিউনিস্ট, সমাজতান্ত্রিক, উগ্র-বামপন্থী, শ্রমিক অধিকার, পরিবেশবাদী ও ফিলিস্তিনপন্থী বিভিন্ন সংগঠন রয়েছে। ফক্স নিউজ এদের সম্মিলিত তৎপরতাকে ‘রেড-গ্রিন’ বা ‘লাল-সবুজ’ নেটওয়ার্ক হিসেবে বর্ণনা করেছে। তবে সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও যোগসূত্রের বিষয়ে এসব দাবি ফক্স নিউজের অনুসন্ধানের ভিত্তিতে করা হয়েছে।
২৪ অক্টোবর নতুন বিক্ষোভের প্রস্তুতি
গত ১৭ অক্টোবর ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হিসাব অনুযায়ী, ওই দিন ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। অন্যদিকে আয়োজকদের দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল ৮ লাখ। বিক্ষোভের একপর্যায়ে প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। খবর দিয়েছে ফরাসি সংবাদমাধ্যম ল্য মঁদ।
এরপর আগামী ২৪ অক্টোবর ‘অ্যাক্ট টু’ নামে নতুন কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়। ফক্স নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্ষোভের স্থান চিহ্নিত করতে একটি ডিজিটাল মানচিত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে ফ্রান্সের বিভিন্ন এলাকায় ২১২টি কর্মসূচির স্থান চিহ্নিত রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া ৩১ অক্টোবর ‘অ্যাক্ট থ্রি’ নামে আরেক দফা কর্মসূচির পরিকল্পনা রয়েছে। এতে হলুদ ভেস্ট পরিহিত বিক্ষোভকারীদের বিভিন্ন সড়ক ও গোলচত্বর অবরোধের কথা বলা হয়েছে। নভেম্বরের ৫ ও ১৪ তারিখেও কর্মসূচির পরিকল্পনা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০ নভেম্বর ইউরোপজুড়ে যুব ধর্মঘটের ডাক
ফ্রান্সের বাইরেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে ফক্স নিউজ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী ২০ নভেম্বর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সমন্বিত যুব ধর্মঘটের আহ্বান জানিয়েছে কমিউনিস্ট, সমাজতান্ত্রিক ও বামপন্থী বিভিন্ন সংগঠন।
‘ফাইট ফর আওয়ার ফিউচার, নট দেয়ার ওয়ারস’—অর্থাৎ ‘আমাদের ভবিষ্যতের জন্য লড়ো, তাদের যুদ্ধের জন্য নয়’ স্লোগানে এই কর্মসূচির প্রচার চালানো হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এতে বিক্ষোভ, ক্লাস বর্জন, সমাবেশ ও অবস্থান কর্মসূচির মতো কার্যক্রমের আহ্বান রয়েছে।
আন্দোলনকারীদের ঘোষিত দাবির মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক বৈষম্য, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসন সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সামরিক খাতে ব্যয়ের বিরোধিতা। তাদের বক্তব্য, এসব সমস্যার সঙ্গে বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার সম্পর্ক রয়েছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংগঠন ‘সোশ্যালিস্ট স্টুডেন্টস’ও এই ধর্মঘটে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে বলে ফক্স নিউজের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংগঠন ও প্রচারমাধ্যমের ভূমিকা
ফক্স নিউজের অনুসন্ধানে ‘ব্রেকথ্রু নিউজ’, ‘কোডপিংক’ এবং ‘পার্টি ফর সোশ্যালিজম অ্যান্ড লিবারেশন’-এর মতো সংগঠন ও প্ল্যাটফর্মের নাম এসেছে। প্রতিবেদনে এসব সংগঠনকে ফ্রান্সের বিক্ষোভের খবর প্রচার এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জোগানোর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া সাংহাইভিত্তিক মার্কিন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা নেভিল রয় সিংহামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু সংগঠন ও সংবাদমাধ্যমের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেছে ফক্স নিউজ। তবে বিক্ষোভ আয়োজন, রাজনৈতিক সমর্থন ও সংবাদ প্রচার—এই পৃথক কার্যক্রমগুলোর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লিখিত সব সংগঠন সরাসরি সহিংসতা সংগঠিত করেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য এতে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
প্রতিবেদনে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলের অধ্যাপক হাতেম বাজিয়ানের কথাও এসেছে। ফক্স নিউজের দাবি, তিনি ফ্রান্সের বিক্ষোভের বিভিন্ন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছেন। একই সঙ্গে তাঁর সঙ্গে ফিলিস্তিনপন্থী বিভিন্ন সংগঠনের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
ম্যাক্রোঁর পদত্যাগের দাবিও উঠেছে
ফ্রান্সের বিক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত একটি ওয়েবসাইট ও টেলিগ্রাম চ্যানেলের মাধ্যমে কর্মসূচি সমন্বয়ের চেষ্টা চলছে বলে ফক্স নিউজ জানিয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আন্দোলনকারীদের একটি ওয়েবসাইটে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর পদত্যাগের দাবি তোলা হয়েছে।
অন্যদিকে, ফ্রান্সের সরকার বিক্ষোভের সময় সহিংসতা ও ভাঙচুরের নিন্দা জানিয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। তবে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেওয়া সবাইকে সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত করে দেখার সুযোগ নেই।
ফক্স নিউজের প্রতিবেদনে ২০২৭ সালের এপ্রিল ও মে মাসেও ফ্রান্সজুড়ে আরও কিছু কর্মসূচির পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব কর্মসূচি বাস্তবায়িত হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
কালের সমাজ/এসআর

