# ঘন কুয়াশায় ঢাকায় ৪ ঘণ্টায় ওঠানামা করেনি কোনো ফ্লাইট
# বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী, বায়ুমান সূচক ৫০-এর নিচে থাকলে বিশুদ্ধ বাতাস ধরা হয়
# বাতাস অতিমাত্রায় দূষিত, মাস্ক ছাড়া বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ
# শীতে ঘন কুয়াশায় নিঃশব্দে বাড়ছে স্বাস্থ্যসংকট
নতুন বছরের শুরু থেকেই ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে প্রাচ্যের নগরীখ্যাত রাজধানী ঢাকা। বলা চলে ঢাকায় শীতের তীব্রতা ক্রমেই যেন বাড়ছে। একইসঙ্গে পার্শ্ববর্তী জেলায়ও মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। এতে সড়ক ও নৌপথে অন্ধকার দৃশ্যমান হয়ে পড়ে। এদিন দুপুরে নগরের কিছু জায়গায় সূর্যের সামান্য দেখা মিললেও পৌষের বাতাসের সবাই শীতের কাপড় পড়ে নিজ নিজ গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে। তবে এদিন ঘন কুয়াশায় ঢাকায় ৪ ঘণ্টায় ওঠানামা করেনি কোনো ফ্লাইট। আর দীর্ঘদিন ঢাকার বাতাস অতিমাত্রায় দূষিত হওয়ায় বাইরে বের হলে সবাইকে মাস্ক পরার পরামর্শ দিয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়।
গতকাল রোববার সকালে তাপমাত্রা নেমেছে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। তবে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, দুপুর পর্যন্ত ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি ধরনের কুয়াশা থাকতে পারে। এদিন সকাল ৭টা থেকে পরবর্তী ছয় ঘণ্টার জন্য ঢাকা ও আশপাশের এলাকার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে এ তথ্য জানানো হয়। পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, দিনের শুরুতে আকাশ অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা থাকতে পারে। এ সময় আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকবে। তবে হালকা থেকে মাঝারি কুয়াশা দেখা যেতে পারে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, উত্তর অথবা উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ৫ থেকে ১২ কিলোমিটার বেগে বাতাস বইতে পারে। দিনের তাপমাত্রা কিছুটা বাড়তে পারে বলেও জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
আবহাওয়া অফিস জানায়, রোববার সকাল ৬টায় ঢাকার তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই সময় বাতাসের আপেক্ষিক আর্দ্রতা ছিল ৯৭ শতাংশ। আজকের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ১২ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গতকাল ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ২১ দশমিক ০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এদিন ঘন কুয়াশার কারণে বিমান চলাচল, অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন ও সড়ক যোগাযোগ সাময়িকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
এদিকে, রোববার ভোর থেকে ঢাকার অলি-গলি থেকে রাজপথ ঘন কুয়াশায় ঢাকা দেখা গেল। শীতের এ দিনগুলোতে এটি স্বাভাবিক মনে হলেও ঢাকার বাতাস বলছে ভিন্ন কথা। প্রশ্ন উঠছে, এ কি শুধু কুয়াশা না কি ধোঁয়াশা। এদিন রাজধানী শহর ঢাকার সারা দিনের বায়ুমান সূচক পর্যবেক্ষণের পর দেখা গেল, যতই দিন গড়াচ্ছে, ঢাকার বাতাসে আরও বেশি দূষণ বাড়ছে। বাতাসের গুণমান সূচকের (একিউআই) মাধ্যমে দূষণের মাত্রা নির্ধারণ করে নিয়মিত বায়ু পরিস্থিতি তুলে ধরে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ার। এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিদিনের বাতাসের মান পরীক্ষা করে সে অনুযায়ী বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকা দিয়ে থাকে। এ তালিকায় সকাল ৯টার দিকে ঢাকার অবস্থান নিচের দিকে থাকলেও বেলা ১২টার থেকে শীর্ষ অবস্থানে দেখা যায়। এরপর বিকেল ৪টার দিকেও শীর্ষ অবস্থানেই ছিল রাজধানী শহরটি। তবে বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী, বায়ুমান সূচক ৫০-এর নিচে থাকলে বিশুদ্ধ বাতাস ধরা হয়।
৫১-১০০ হলে তা সহনীয়। ১০১ থেকে ১৫০-এর মধ্যে হলে সতর্কতামূলক বা সংবেদনশীল মানুষের (শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তি) জন্য অস্বাস্থ্যকর। ১৫১-২০০ হলে সবার জন্য অস্বাস্থ্যকর এবং সূচক ২০১ থেকে ৩০০ হলে বাতাসকে খুব অস্বাস্থ্যকর বলা হয়। আর সূচক ৩০০ ছাড়ালে সেই বাতাস দুর্যোগপূর্ণ। এদিন সকাল ৯টার দিকে আইকিউএয়ারের রেকর্ড অনুযায়ী ঢাকার স্কোর ছিল ১৯২, যা সবার জন্য অস্বাস্থ্যকর বাতাসের নির্দেশক। কিন্তু বেলা ১২টায় আইকিউএয়ারের তালিকায় গিয়ে দেখা যায়, ঢাকার স্কোর ৪০৬, যা দুর্যোগপূর্ণ বাতাসের নির্দেশক। যদিও সাধারণ শীতের মৌসুমে বাতাস থাকে শুষ্ক। বাতাসে ধূলিকণার পরিমাণ বেড়ে যায়। আর এই কারণে বায়ুদূষণও বাড়তে থাকে।
তবে এ মৌসুমে প্রথমবারের মতো ঢাকার বাতাসের মান দুর্যোগপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছাল। বিকেল ৪টায় আইকিউএয়ার তালিকা পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেল, দীর্ঘদিন দুর্যোগপূর্ণ অবস্থায় থাকা দিল্লি-কলকাতা-লাহোরের অবস্থার উন্নতি হলেও ঢাকা দুর্যোগপূর্ণ অবস্থাতেই রয়েছে। এ সময় ঢাকার স্কোর দেখা যায় ৩০৯। ধোঁয়াশা ঘেরা এই ঢাকার মধ্যে কিছু এলাকার অবস্থা সবচেয়ে বেশি দুর্যোগপূর্ণ। এর মধ্যে শীর্ষে আছে বেচারাম দেউড়ি। পুরান ঢাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই এলাকায় বায়ুদূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি। এরপর দক্ষিণ পল্লবী, গোড়ান ও গুলশান ২-এর বে’জ এজওয়াটার আউটডোর এলাকায় দূষণের মাত্রা বিপজ্জনক অবস্থায়। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইকিউএয়ারের তালিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাতাসের মূল ক্ষতিকারক উপাদান হলো ক্ষুদ্র বস্তুকণা বা পিএম ২.৫।
এটি এতই সূক্ষ্ম যে তা ফুসফুসে এমনকি রক্তপ্রবাহেও প্রবেশ করতে পারে। ঢাকার বাতাসে অতিক্ষুদ্র বস্তুকণাই দূষণের প্রধান উৎস। বেশিমাত্রার দূষণ শ্বাসতন্ত্রের রোগ, হৃদ্রোগ এবং দীর্ঘ মেয়াদে ক্যানসারের মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। দীর্ঘদিন ঢাকার বাতাস অতিমাত্রায় দূষিত হওয়ায় বাইরে বের হলে সবাইকে মাস্ক পরার পরামর্শ দিয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া সংবেদনশীল ব্যক্তিদের অতি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়ার অনুরোধও করা হয়েছে।
শিশু, বয়স্ক, হৃদ্রোগ বা শ্বাসকষ্টের রোগীদের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল গোষ্ঠীর মানুষের এ সময় ঘরের বাইরে না যাওয়াই ভালো। যারা সাধারণ সুস্থ ব্যক্তি তাদের উচিত বাইরে কাটানো সময় সীমিত করা এবং শারীরিক পরিশ্রমের কাজ এড়িয়ে চলা।
আর যদি বাইরে বের হতে হয়, তবে অবশ্যই দূষণ রোধে কার্যকর মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। এ সময় ঘরের ভেতরের বাতাস পরিষ্কার রাখতে এয়ার পিউরিফায়ার ব্যবহার এবং দূষিত বাতাস প্রবেশ ঠেকাতে জানালা ও দরজা বন্ধ রাখলে ভালো হয়।
বিমানবন্দরে ৪ ঘণ্টা ফ্লাইট ওঠানামা বন্ধ: ঘন কুয়াশার কারণে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৪ ঘণ্টা কোনো ফ্লাইট ওঠানামা করতে পারেনি। গতকাল রোববার সকাল ৬টার পর কুয়াশায় চারপাশ না দেখা যাওয়ায় কোনো ফ্লাইট ঢাকা ছাড়তে পারেনি। একই কারণে ঢাকার আকাশে থাকা প্রায় ৬টি ফ্লাইট অবতরণ করতে পারেনি।
শাহজালাল বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এসএম রাগীব সামাদ বলেন, বিমানবন্দর ঘোষণা দিয়ে বন্ধ ছিল বিষয়টি তা নয়। সকাল ৬টার পর থেকে ভিজিবিলিটি ছিল না। কোনো ফ্লাইট উড্ডয়ন ও অবতরণ করতে পারেনি। পরে ৯টা ৫২ মিনিটে ফ্লাইট চলাচল শুরু হয়। তবে বিমানবন্দর সূত্র জানায়, বর্তমানে বেশ কয়েকটি ফ্লাইট ঢাকার আকাশে চক্কর খাচ্ছে। অনুমতি পেলে ফ্লাইটগুলো একের পর এক অবতরণ করবে।
শীতে ঘন কুয়াশায় নিঃশব্দে বাড়ছে স্বাস্থ্যসংকট: শীতে ঘন কুয়াশায় নিঃশব্দে বাড়ছে স্বাস্থ্যসংকট। এ জন্য যাদের ঝুঁকি বেশি, তাদের সতর্ক করলেন চিকিৎসকরা। তাদের মতে, শীতের কুয়াশার সঙ্গে বাতাসে ভাসমান সূক্ষ্ম ধূলিকণা, যানবাহনের ধোঁয়া ও শিল্প কারখানার দূষক একত্রে মিশে ঘনীভূত বায়ু তৈরি করে। তারা বলছেন, শীতকালের কুয়াশা শুধু দৃশ্যমানতার সমস্যা তৈরি করে না, বরং শ্বাসযন্ত্র, হৃদযন্ত্র এবং শিশু-বয়স্কদের স্বাস্থ্যের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। তাদের মতে, শীতের কুয়াশার সঙ্গে বাতাসে ভাসমান সূক্ষ্ম ধূলিকণা, যানবাহনের ধোঁয়া ও শিল্প কারখানার দূষক একত্রে মিশে ঘনীভূত বায়ু তৈরি করে।
এই কণাগুলি ফুসফুসে প্রবেশ করে শ্বাসকষ্ট বাড়িয়ে দেয়। হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস ও ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ-এ আক্রান্ত রোগীদের সমস্যা এই সময়ে অনেক মাত্রায় বেড়ে যায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, যাঁদের আগে শ্বাসকষ্টের সমস্যা ছিল না, দীর্ঘদিন কুয়াশায় থাকলে তাঁরাও কাশি, গলা খুসখুস ও শ্বাস নিতে অসুবিধার মতো উপসর্গে ভোগেন। চিকিৎসকদের মতে, কুয়াশা ও ঠান্ডা বাতাস হৃদরোগীদের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। ঠান্ডার কারণে রক্তনালী সংকুচিত হয়ে রক্তচাপ বাড়তে পারে।
তার সঙ্গে দূষিত বায়ু মিশে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। শীতকালে হৃদরোগ-সংক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ার কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা এই পরিবেশগত পরিবর্তনকেই দায়ী করছেন। তবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু ও বয়স্করা। অন্যদিকে বয়স্কদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক কম, ফলে কুয়াশার সময় চোখ জ্বালা, গলা ব্যথা, মাথাব্যথা ও ঘন ঘন সর্দি-কাশির সমস্যা দেখা যায়।
তবে শীতে ঘর থেকে কাজের বের হওয়া সাধারণ মানুষজনকে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারমধ্যে রয়েছে-ঘন কুয়াশায় ভোরে হাঁটা বা শরীরচর্চা এড়িয়ে চলা,বাইরে বের হলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার, যথেষ্ট গরম পোশাক পরা,ধূমপান সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা,ঘরের ভিতর পরিষ্কার বাতাস বজায় রাখা, দীর্ঘদিন কাশি, শ্বাসকষ্ট বা বুকে অস্বস্তি থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। তবে চিকিৎসকদের মতে, শীতের কুয়াশা শরীরের জন্য নিঃশব্দে বিপদ ডেকে আনতে পারে। সচেতনতা ও সামান্য সতর্কতাই পারে এই নীরব শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করতে।
একুশে সংবাদ/ওজি

