মধুমতি নদীর বুক চিরে জেগে ওঠা তপ্ত বালুচরই এখন মাগুরার মহম্মদপুরের অবহেলিত ও নদীভাঙন কবলিত কৃষকদের জন্য হয়ে উঠেছে এক পরম ‘সোনার খনি’। প্রমত্তা মধুমতি নদীর বিস্তৃর্ণ চরাঞ্চলজুড়ে এখন শুধুই নয়ন জুড়ানো সবুজের সমারোহ।
আর এই বিস্তৃর্ণ সবুজ পাতার নিচেই লুকিয়ে আছে শত শত কৃষকের সোনালী স্বপ্ন; থোকা থোকা বাদাম। চলতি মৌসুমে মধুমতির চরে বাদামের অভূতপূর্ব বাম্পার ফলন হয়েছে। ফলন ও চমৎকার বাজারদর দুটোই অনুকূলে থাকায় নদীপাড়ের সাত শতাধিক কৃষক পরিবারের ঘরে এখন বইছে উৎসবের আমেজ। আগামী বর্ষার ঢল চরে আছড়ে পড়ার আগেই দ্রুত মাঠের ফসল ঘরে তুলতে দিনরাত ব্যস্ত সময় পার করছেন ¯’ানীয় কৃষকেরা।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, মহম্মদপুরের চরাঞ্চলের পলিযুক্ত বেলে মাটি ও সামগ্রিক আবহাওয়া বাদাম চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। বিগত বছরের তুলনায় এবার আবাদের পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছর এই উপজেলায় যেখানে ৪৯০ বিঘা জমিতে বাদাম চাষ হয়েছিল, সেখানে ফলন ভালো হওয়ায় ও ব্যাপক লাভের মুখে চলতি মৌসুমে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১০ বিঘায়। এবার কৃষকেরা মূলত উ”চ ফলনশীল জাতের ‘বারি চিনা বাদাম-৫, ৮, ৯’, ‘বিনা চিনা বাদাম-৪’, ‘হোল্ডার হাইবৃড’ এবং কিছু উৎকৃষ্ট মানের ¯’ানীয় জাতের বাদামের আবাদ করেছেন। চরের উর্বর পলিমাটিতে এসব উন্নত জাতের ফলন হয়েছে চোখে পড়ার মতো।
চরাঞ্চলের অভিজ্ঞ চাষিরা জানান, ধান বা অন্য ফসলের তুলনায় চরের বালু মাটিতে বাদাম চাষে খরচ অত্যন্ত কম। রোগবালাই ও পোকার উপদ্রব তুলনামূলক কম হওয়ায় অল্প পুঁজিতেই এখানে অধিক লাভ করা সম্ভব হ”েছ। তা ছাড়া, দেশজুড়ে চিনা বাদামের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আমদানিকৃত বিদেশি বাদামের চেয়ে মধুমতির চরে উৎপাদিত এই বাদামের স্বাদ, সুগন্ধ ও পুষ্টিগুণ অনেক বেশি হওয়ায় বাজারে এর কদর ও সুখ্যাতি সম্পূর্ণ আলাদা। মহম্মদপুর উপজেলার বাবুখালী, মহম্মদপুর ও পলাশবাড়ীয়া ইউনিয়নের সাত শতাধিক কৃষক এবার মধুমতির চরাঞ্চলে বাদাম উৎপাদন করে সাফল্য অর্জন করেছেন।
মধুমতির তপ্ত চরে দাঁড়িয়ে পরম যত্নে নতুন বাদাম তুলতে তুলতে দীর্ঘ তিন দশকের অভিজ্ঞ চাষি মো. কওছার শেখ (৬৮) অত্যন্ত আবেগপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “আমি এবার সাড়ে পাঁচ বিঘা জমিতে বাদাম চাষ করেছি। সঠিক সময়ে পরিচর্যা ও অনুকূল আবহাওয়া পাওয়ায় ফলন চমৎকার হয়েছে। আশা করছি ৪৫ থেকে ৫০ মণ শুকনো বাদাম ঘরে তুলতে পারব। আমার বাবা-দাদারাও এই চরে বাদাম চাষ করতেন, যুগের পর যুগ ধরে আমরা এই মাটির সাথে লড়ছি। চরের বালু জমিতে অন্য ফসল তেমন ভালো হয় না, কিš‘ বাদাম খুবই ভালো হয়।”
আরেকজন সফল ও উদ্যোমী চাষি আব্দুল হামিদ এবার প্রায় ১২ বিঘা চরের জমিতে বাদামের আবাদ করেছেন। তিনি চরে বাদাম চাষের বাড়তি সুবিধার কথা উল্লেখ করে জানান, “বাদাম চাষের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, আষাঢ়ের ঢল ও বর্ষার তীব্র রূপ ধারণ করার আগেই এই ফসল সম্পূর্ণ পরিপক্ব হয়ে ওঠে এবং ঘরে তুলে ফেলা যায়। ফলে বন্যার কারণে বা আগাম বন্যায় ফসল ডুবে যাওয়ার কোনো ঝুঁকি বা অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা থাকে না বললেই চলে।”
ইতোমধ্যেই মহম্মদপুরের ¯’ানীয় পাইকারি বাজারগুলোতে পুরোদমে নতুন চিনা বাদাম আমদানি হতে শুরু করেছে। বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সরব উপ¯ি’তিতে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। বর্তমানে মানভেদে প্রতি মণ কাঁচা ও আধা-শুকনো বাদাম বিক্রি হ”েছ সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা থেকে ছয় হাজার টাকা দরে। উৎপাদন খরচের তুলনায় এই বাজারদর অত্যন্ত লাভজনক ও আশাব্যঞ্জক হওয়ায় চাষিদের মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটেছে। চরের এই বিপুল সম্ভাবনাকে যদি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আরও সম্প্রসারিত করা যায়, তবে দেশের বাদাম আমদানি নির্ভরতা অনেকাংশে কমে আসবে বলে মনে করছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা।
উপজেলা কৃষি অফিসার পিযুষ রায় এই অভাবনীয় সাফল্যের বিষয়ে অত্যন্ত আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “বাদাম চাষের জন্য এবার আবহাওয়া অনুকূলে ছিল। আমরা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদের যথাসময়ে সঠিক পরামর্শ দিয়েছি। মধুমতি নদীর চরাঞ্চলের কৃষকরা এখন বাদাম চাষে অনেক বেশি দক্ষ ও পরিপক্ব। অল্প খরচে উ”চ মুনাফা নিশ্চিত হওয়ায় প্রতি বছরই এখানে বাদাম চাষের পরিধি বাড়ছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।”
কালের সমাজ/কে.পি

