নশ্বর এই পৃথিবীতে মানুষের কত শত হিসাব-নিকাশ। লাভ-ক্ষতি, স্বার্থ আর আত্মকেন্দ্রিকতার জাঁতাকলে পিষ্ট সমসাময়িক সমাজব্যবস্থা। ভাইয়ে-ভাইয়ে বিরোধ, সামান্য স্বার্থে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ভাঙন যেখানে নিত্যদিনের চিত্র; সেখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আলোকবর্তিকা হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার দুই প্রৌঢ়। গোলাম সরোয়ার মোল্যা (৫৬) এবং শ্যামল দত্ত (৫৫)। একজন মুসলিম, অন্যজন সনাতন ধর্মাবলম্বী।
ধর্মের ভিন্নতা কিংবা সমাজের চেনা ছক; কোনো কিছুই বাঁধা হতে পারেনি তাঁদের চার দশকের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কে। বরং বন্ধুত্বের বন্ধন যেন আলগা না হয়ে যায়, সেই আশঙ্কায় দুজনে জীবনের একটি বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন; তাঁরা কেউ বিয়ে করেননি।
মহম্মদপুর উপজেলার বাবুখালী ইউনিয়নের বাশো গ্রামের মৃত: শাহাজদ্দিন মোল্যার ছেলে গোলাম সরোয়ার মোল্যা এবং দাতিয়াদাহ গ্রামের মৃত: গোপাল চন্দ্র দত্তের ছেলে শ্যামল দত্ত। তাঁদের এই রূপকথার মতো পথচলার শুরুটা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ৪০ বছর আগে, ১৯৮৭ সালের দিকে। তখন গোলাম সরোয়ার মোল্যা বাবুখালী আফতাব উদ্দিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র এবং শ্যামল দত্ত একই বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণিতে পড়তেন। কৈশোরের সেই চঞ্চল দিনগুলোতেই দুজনের মনের আঙিনায় রোপিত হয়েছিল বন্ধুত্বের বীজ। ১৯৮৮ সালে সরোয়ার এসএসসি পাস করার পর পড়াশোনার পাট চুকিয়ে ফেলেন। এর কিছুদিন পর দশম শ্রেণিতে ওঠার পর শ্যামলও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি টানেন। তবে পড়াশোনা ছাড়লেও একে অপরের হাত ছাড়েননি তাঁরা। খেলাধূলা, আড্ডা, ঘোরাঘুরি, সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি; সবখানেই তাঁরা ছিলেন ছায়ার মতো।
কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পদার্পণ করে জীবিকার তাগিদে ১৯৯৬ সালে দুই বন্ধু মিলে মহম্মদপুর উপজেলার বাবুখালী বাজারে শুরু করেন একটি মুদি দোকান। নাম দেন ‘সেবা স্টোর’। সেই থেকে শুরু, দীর্ঘ তিন দশক (৩০ বছর) ধরে যৌথভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছেন তাঁরা। বর্তমান সময়ে অংশীদারি ব্যবসায় যেখানে সামান্য টাকার এদিক-ওদিকের কারণে অবিশ্বাস আর মামলা-মোকদ্দমা অবধারিত, সেখানে সরোয়ার ও শ্যামলের রসায়ন এক পরম বিস্ময়। দোকানে ক্যাশবাক্স একটিই। যাঁর যখন যা প্রয়োজন, পণ্য কিংবা টাকা; নির্দ্বিধায় নিয়ে নেন। নেই কোনো হিসাবের কড়াকড়ি, নেই কোনো দিনশেষে লাভের ভাগাভাগি নিয়ে তর্ক। চার দশকে তাঁদের মধ্যে কোনোদিন কোনো বিষয়ে মান-অভিমান কিংবা অনুযোগের সৃষ্টি হয়নি।
কিন্তু এই বাস্তব গল্পের সবচেয়ে চমকপ্রদ ও আবেগঘন অধ্যায়টি হলো তাঁদের অবিবাহিত থাকার গল্প। বয়স পঞ্চাশের কোটা পেরিয়েছে বহু আগে। দুই বন্ধুর উপরই নিজ নিজ পরিবার থেকে বিয়ে করার জন্য প্রচন্ড চাপ ছিল। কিন্তু এক অদ্ভুত ও নিঃস্বার্থ আশঙ্কায় দুজনেই ছিলেন অনড়। তাঁদের ভয় ছিল; বিয়ে করলে যদি সংসারে টানাপোড়েন তৈরি হয়, যদি স্ত্রীদের কারণে দুই বন্ধুর সম্পর্কে ফাটল ধরে! বন্ধুত্বের পবিত্রতা ধরে রাখতে তাঁরা বেছে নিয়েছেন চিরকুমার জীবন।
ধর্মীয় ভিন্নতা এই দীর্ঘ পথচলায় কখনোই তাঁদের মধ্যে কোনো দেয়াল তুলতে পারেনি। গোলাম সরোয়ার মোল্যা, ইসলাম ধর্মের সব নিয়ম মেনে নামাজ-রোজা করেন, অন্যদিকে শ্যামল দত্ত তাঁর সনাতন ধর্মের পূজা-পার্বণ ও সংস্কৃতি পালন করেন। তবে উৎসবের আনন্দটা তাঁদের যৌথ। ঈদে শ্যামল যান সরোয়ারের বাড়িতে, আর পূজায় সরোয়ার মোল্যা শামিল হন শ্যামলের আনন্দে। একে অপরের বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া আর একসাথে পথচলা; সব মিলিয়ে তাঁরা যেন একই বৃত্তের দুইটি ফুল।
বর্তমানে তাঁদের ‘সেবা স্টোর’ কেবল মুদি সামগ্রীই নয়, বরং বিকাশ, নগদ ও অনলাইনের বিভিন্ন সেবা দিয়ে এলাকার একটি বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দুই বন্ধু মিলেমিশে সামলান এই দোকান।
আজকের এই কৃত্রিম ও স্বার্থপর পৃথিবীতে গোলাম সরোয়ার মোল্যা এবং শ্যামল দত্তের গল্পটি কেবল একটি সংবাদ নয়; এটি এক জীবন্ত দর্শন। যেখানে কোনো লাভ-লোভ নেই, আছে কেবলই আত্মিক টান। দুই বন্ধুর কণ্ঠে আজও অনুরণিত হয় একই সুর, ‘যতদিন বাঁচব, একসাথেই থাকব।’ তাঁদের এই বিরল ও নিঃস্বার্থ বন্ধন সমাজকে শিক্ষা দেয়; যুগ বদলে গেলেও, সত্যিকারের বন্ধুত্ব আজও অমলিন।
কালের সমাজ/কে.পি

