মাগুরার হাজারো বেকার তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান, আইসিটি উদ্যোক্তা তৈরি এবং পিছিয়ে পড়া ও প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে আধুনিক প্রযুক্তি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তোলার স্বপ্ন নিয়ে শুরু হয়েছিল ‘মাগুরা আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার’ প্রকল্প।
প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এই কেন্দ্রটি জেলার ডিজিটাল অগ্রযাত্রার অন্যতম বড় আশার প্রতীক হওয়ার কথা ছিল। অথচ আট বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটির কাজ শেষ হয়নি। বরং আধুনিক প্রযুক্তি কেন্দ্রটি এখন পরিণত হয়েছে ঘন জঙ্গল, কাশবন, সাপ, শিয়াল ও বেজির অভয়ারণ্যে। এ কারণেই স্থানীয়দের মুখে মুখে এটির নতুন নাম ‘ফক্স পার্ক’।
বুধবার (২২ জুলাই) সকালে সরেজমিনে মাগুরা শহরের স্টেডিয়ামপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, মূল ফটকে ঝুলছে তালা। প্রায় সাড়ে পাঁচ একর সরকারি জমির উপর নির্মিত ছয়তলা গোলাকৃতির দৃষ্টিনন্দন ভবনটি চারপাশ থেকে ঘন আগাছা, ঝোপঝাড় ও কাশবনে ঢেকে গেছে। দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পুরো এলাকা জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, শুধু রাতেই নয়, দিনের বেলাতেও এখানে শিয়াল, সাপ, বেজিসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণীর অবাধ বিচরণ দেখা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের আটটি জেলায় মোট ৫৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এর মধ্যে মাগুরা কেন্দ্রের জন্য বরাদ্দ প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা। প্রকল্পটির নির্মাণকাল ছিল মাত্র দেড় বছর। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে প্রকল্প অনুমোদনের পর ২০১৮ সালের জুলাইয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লিটন ট্রেডার্স নির্মাণ কাজ শুরু করে। ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যায়। এরপর দফায় দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে সর্বশেষ চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সময় দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ৬৪ শতাংশের কিছু বেশি।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, একই প্রকল্পের আওতায় দেশের অন্য সাতটি জেলার ইনকিউবেশন সেন্টারের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। শুধু মাগুরার প্রকল্পটিই অজ্ঞাত কারণে বছরের পর বছর ধরে ঝুলে রয়েছে। এতে জেলার তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সম্ভাবনা যেমন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি কর্মসংস্থান ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন হাজারো তরুণ-তরুণী।
মাগুরা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ডালিফাই ইয়াসমিন বলেন, “এই কেন্দ্র চালু হলে আমাদের প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা আধুনিক কম্পিউটার ও আইসিটি প্রশিক্ষণের সুযোগ পেত। তাদের দক্ষ করে গড়ে তোলার যে স্বপ্ন দেখেছিলাম, সেটি এখন দীর্ঘশ্বাসে পরিণত হয়েছে।”
স্থানীয় কলেজ শিক্ষার্থী মহুয়া পারভীন বলেন, “প্রতিবারই শুনি কাজ শেষ হবে, কিন্তু বাস্তবে কোনো অগ্রগতি দেখি না। এত বড় একটি প্রকল্প বছরের পর বছর পড়ে থাকাটা খুবই হতাশাজনক।”
স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় সরকারি কোটি কোটি টাকার অবকাঠামো নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি পুরো এলাকাটি নিরাপত্তা ঝুঁকিতেও পড়েছে। রাতে তো বটেই, দিনের বেলাও সাধারণ মানুষ ভবনের আশপাশে যেতে ভয় পান। দ্রুত প্রকল্পটি শেষ না হলে ভবিষ্যতে ভবনের কাঠামোগত ক্ষতিও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
মাগুরাবাসীর প্রত্যাশা, আর কোনো সময়ক্ষেপণ নয়। দ্রুত জঙ্গল পরিষ্কার করে, অসমাপ্ত কাজ শেষ করে আধুনিক এই প্রযুক্তি কেন্দ্রটি চালু করা হোক। ‘ফক্স পার্ক’ নামে পরিচিতি পাওয়া এই অবহেলিত স্থাপনাই যেন একদিন সত্যিকার অর্থে জেলার তথ্যপ্রযুক্তি বিকাশ, উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী ‘আইটি পার্ক’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক ড. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, “সারাদেশে আটটি ইনকিউবেশন সেন্টারের মধ্যে সাতটির কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। মাগুরা কেন্দ্রের অবশিষ্ট কাজ এই অর্থবছরের মধ্যেই শেষ করা সম্ভব হবে বলে আমরা আশাবাদী।
কালের সমাজ/কে.পি

