ঢাকা বুধবার, ০৫ আগস্ট, ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩

রাজশাহী গোদাগাড়ী পৌরসভার ১০ কোটি টাকার সড়ক সংস্কারে অনিয়মের অভিযোগ

জেলা প্রতিনিধি, রাজশাহী | আগস্ট ২, ২০২৬, ০৬:২৮ পিএম রাজশাহী গোদাগাড়ী পৌরসভার ১০ কোটি টাকার সড়ক সংস্কারে অনিয়মের অভিযোগ

রাজশাহীর গোদাগাড়ী পৌরসভার প্রায় ১০ কোটি টাকার সড়ক সংস্কার প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, কাজের সিডিউল না মেনে তিন নম্বর ইটের খোয়া, ভরাট বালু, এঁটেল মাটি ও নিম্নমানের পাথর ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি বৃষ্টির মধ্যেও ঢালাই কাজ চলেছে। এসব অভিযোগকে কেন্দ্র করে স্থানীয়রা দুই দফায় কাজ বন্ধও করে দেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, পৌরসভার সুলতানগঞ্জ এলাকায় সড়ক সংস্কারকাজে ব্যবহারের জন্য নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী মজুত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে ড্রেন নির্মাণ ও সড়ক সংস্কারে ব্যবহৃত সামগ্রীর মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের (এলজিইডি) আরইউটিডি প্রকল্পের আওতায় ১০ কোটি ১৯ লাখ টাকা ব্যয়ে চার কিলোমিটার ৯৮০ মিটার সড়ক এবং এক হাজার ২০০ মিটার ড্রেন নির্মাণের কাজ চলছে। কাজটির মূল ঠিকাদার ঢাকার এমএ ইঞ্জিনিয়ারিং হলেও সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করছে রাজশাহীর এলিজা এন্টারপ্রাইজ। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়।

গোদাগাড়ী থানা সংলগ্ন এলাকা থেকে শুরু হওয়া ড্রেন নির্মাণকাজে স্থানীয়রা নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ করেন। এলাকাবাসীর দাবি, ড্রেনের ঢালাইয়ে ব্যবহৃত ইটের খোয়া ও পাথর সহজেই ভেঙে যাচ্ছে। এছাড়া সিডিউলে ডোমার বালু ব্যবহারের কথা থাকলেও স্থানীয় নিম্নমানের বালু ব্যবহার করা হয়েছে।

ড্রেন নির্মাণ শেষে খননকৃত মাটি, বালু, পাথর ও রাবিশ দীর্ঘদিন ধরে সড়কের পাশে ফেলে রাখায় জনদুর্ভোগ বেড়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই কাদা ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। এতে রিকশা, ভ্যান ও মোটরসাইকেল চলাচল ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এদিকে পদ্মা নদীসংলগ্ন এলাকায় কয়েক মাস আগে একটি সেতু ভেঙে ফেলার পরও নতুন সেতুর কাজ শুরু হয়নি। এতে হাট, ডাকবাংলো ও আশপাশের এলাকার লক্ষাধিক মানুষকে প্রায় এক কিলোমিটার ঘুরে বিকল্প পথে চলাচল করতে হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, “সড়কের কাজ শেষ হওয়ার পর সেতু ভাঙা হলে মানুষের এত ভোগান্তি হতো না। এখন হাটে আসা ব্যবসায়ীরাও পণ্য মাথায় করে আনতে বাধ্য হচ্ছেন।”

ভগবন্তপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ড্রেন খননের মাটি দিয়ে একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন পুকুর ভরাট করা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সংশ্লিষ্টদের ‘ম্যানেজ’ করেই এ কাজ চলছে। একই এলাকায় বৃষ্টির মধ্যেই ড্রেনের ঢালাইয়ের কাজ চলতে দেখা যায়।

আরইউটিডি প্রকল্পের উপসহকারী প্রকৌশলী হারেস শেখ বলেন, “ঢালাইয়ের উপকরণ আগেই প্রস্তুত করা হয়েছিল, তাই কাজ চালিয়ে যেতে হয়েছে।” তবে এতে কাজের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হবে কি না—এ প্রশ্নে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

সুলতানগঞ্জ ও গাঙ্গোবাড়ি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সড়কের সাব-বেজে ভরাট বালুর সঙ্গে তিন নম্বর ইটের খোয়া, এঁটেল মাটি ও ইটভাটার রাবিশ ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়মের প্রতিবাদে স্থানীয়রা দুই দফায় কাজ বন্ধ করে দেন।

স্থানীয় বাসিন্দা আবু তালেব বলেন, “এভাবে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ করলে ছয় মাসও রাস্তা টিকবে না। অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাইনি।”

সুলতানগঞ্জে ঠিকাদারের ইয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, বিপুল পরিমাণ ভরাট বালুর সঙ্গে তিন নম্বর ইটের খোয়া মিশিয়ে রাখা হয়েছে। যদিও সাব-কন্ট্রাক্ট প্রতিষ্ঠান এলিজা এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধিরা দাবি করেন, সব নির্মাণসামগ্রী সিডিউল অনুযায়ী ব্যবহার করা হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকাদারকে সহযোগিতা করছেন পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত সচিব ও সহকারী প্রকৌশলী সারওয়ার জাহান মুকুল, উপসহকারী প্রকৌশলী জাহিদুল হক এবং আরইউটিডি প্রকল্পের সহকারী প্রকৌশলী মামুনুর রশিদ ও উপসহকারী প্রকৌশলী হারেস শেখ।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সহকারী প্রকৌশলী সারওয়ার জাহান মুকুল বলেন, “তিন নম্বর ইটের খোয়া বা নিম্নমানের বালু ব্যবহারের অভিযোগ সঠিক নয়। সিডিউল অনুযায়ী পাথর ব্যবহার করা হচ্ছে। ইয়ার্ডে থাকা নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার না করার আশ্বাস দিয়েছে ঠিকাদার। প্রকৌশলীদের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগও ভিত্তিহীন।”

এলিজা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আসাদুল ইসলাম বলেন, “বৃষ্টির কারণে ইটের রঙ নষ্ট হয়েছে। তিন নম্বর ইট বা নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ সত্য নয়। প্রকৌশলীদের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।”

এ বিষয়ে এলজিইডি রাজশাহীর নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ বলেন, “আমি বর্তমানে ঢাকায় সভায় আছি। রাজশাহীতে ফিরে অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করব। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কালের সমাজ/কে.পি

Link copied!