এক নামে সরকারি চাকুরি, অন্য নামে জমি কেনার অভিযোগ। জাতীয় পরিচয়পত্র ও চাকুরির নথিতে জন্মতারিখ ১৯৮০ সাল হলেও পাসপোর্টে তা ১৯৬৩। এর সঙ্গে রয়েছে সরকারি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া পাসপোর্ট করা ও ইতালি ভ্রমণের অভিযোগ। পরিচয়, জন্মতারিখ ও সম্পত্তির দলিলের এমন একাধিক অসঙ্গতির অভিযোগে কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার মাইরাগাঁও মন্নাফ স্মৃতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আনোয়ারা আক্তারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করেছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস।
২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে জারি করা অভিযোগনামায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(খ) ধারায় অসদাচরণের অভিযোগ আনা হয়।
বিভাগীয় মামলার নথি অনুযায়ী, আনোয়ারা আক্তারের চাকুরির নথি ও জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্মতারিখ ৮ মার্চ ১৯৮০। অথচ তাঁর পাসপোর্টে জন্মতারিখ ২ জানুয়ারি ১৯৬৩।
একই ব্যক্তির গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথিতে জন্মসনের ব্যবধান প্রায় ১৭ বছর। শুধু তাই নয়, অভিযোগসংশ্লিষ্ট নথিতে তাঁর বড় ছেলের জন্মসন ১৯৮৩ উল্লেখ রয়েছে। ফলে জন্মতারিখের এই পার্থক্য নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।১৯৯৮ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সময়কার তথ্যও বিষয়টিকে আরও জটিল করেছে। তিনি চৌদ্দগ্রাম উপজেলার আলকরা ইউনিয়নের বাকগ্রাম কাজী আহমদ আলী হাই স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। তাঁর এসএসসি রেজিস্ট্রেশন নম্বর ০৪৯০১৪/১৯৯৪/৯৫ বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
পাসপোর্টের জন্মতারিখ ১৯৬৩ সাল হলে ১৯৯৮ সালে তাঁর বয়স প্রায় ৩৫ বছর। অন্যদিকে চাকুরির নথিতে জন্মতারিখ ১৯৮০ সাল হলে একই সময়ে বয়স দাঁড়ায় মাত্র ১৮ বছর। ফলে কোন তথ্যের ভিত্তিতে এসএসসি, জাতীয় পরিচয়পত্র ও চাকরির নথিতে বয়স নির্ধারণ করা হয়েছিল—এখন সেটিই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন?
‘আনোয়ারা’ চাকুরিতে, ‘জাহানারা’ জমির দলিলে
বিভাগীয় মামলার অভিযোগে সম্পত্তি ক্রয়ের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আনোয়ারা আক্তার নামে সরকারি চাকুরিতে থাকলেও কয়েকটি সম্পত্তির দলিলে ‘মোসা. জাহানারা আক্তার ভুলু’ নাম ব্যবহার করা হয়েছে।
অভিযোগনামায় ২০১৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারির ১৭০৭/১৩ নম্বর দলিল, একই বছরের ২২ অক্টোবরের ৯৭২১/১৩ নম্বর দলিল এবং ২০১৯ সালের ৪ সেপ্টেম্বরের ৮৭৭০/১৯ নম্বর দলিলের উল্লেখ রয়েছে।
নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৩ সালে ৯৭২১/১৩ নম্বর দলিলে তিন ডিং এবং ২০১৯ সালে ৮৭৭০/১৯ নম্বর দলিলে আরও তিন ডিং জমি ‘জাহানারা’ নামে কেনা হয়েছে।
এখানেই উঠছে বড় প্রশ্ন—আনোয়ারা আক্তার ও ‘জাহানারা আক্তার ভুলু’ কি একই ব্যক্তি? যদি একই ব্যক্তি হন, তাহলে সরকারি চাকুরির নথির বাইরে অন্য নামে সম্পত্তি কেনার কারণ কী? আর যদি আলাদা ব্যক্তি হন, তাহলে তাঁদের মধ্যে সম্পর্ক কী?
সরকারি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই ২০১৪ সালের ২৩ মার্চ আনোয়ারা আক্তার পাসপোর্ট করেন। পাসপোর্ট নম্বর বিএ-০৭০৩৯২৭।এর পর ২০১৫ সালে তিনি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই ইতালি ভ্রমণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরকারি কর্মচারী হিসেবে বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে যথাযথ অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না এবং পাসপোর্টে ব্যবহৃত জন্মতারিখের ভিত্তি কী ছিল—এসব বিষয়ও বিভাগীয় তদন্তে যাচাই হওয়ার কথা।
জন্মতারিখ পরিবর্তনের কথা ও অভিযোগের বিষয়ে আনোয়ারা আক্তার নিজের বক্তব্যে বলেন, তাঁর প্রকৃত জন্ম ১৯৬৩ সালে। চাকুরিতে প্রবেশের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র ও এসএসসি সনদে ১৯৮০ সাল করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, আমার স্বামী সিরাজুল ইসলাম এই বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তিনি মারা যাওয়ার পর গ্রামের সবাই মিলে আমাকে এই স্কুলে চাকুরি দেন। চৌদ্দগ্রামের কাজী আহমদ আলী হাই স্কুল থেকে ১৯৯৮ সালে আমার জন্মতারিখ ১৯ বছর বানিয়ে আমার ভাই জসিম উদ্দিন আমাকে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। তখন আমার বয়স ৩০ বছর ছিল। আমার প্রকৃত জন্ম ১৯৬৩ সালে। চাকুরির জন্য এনআইডি ও এসএসসি সনদে ১৯৮০ সাল করেছি।
জমি কেনা এবং মেয়ের জাতীয় পরিচয়পত্রে ‘জাহানারা’ নাম ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আনোয়ারা ও জাহানারা—দুটিই আমার নাম।
মাইরাগাঁও মন্নাফ স্মৃতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শারমিন আক্তার বলেন, ২০২৫ সালে তদন্ত আসার পর বিষয়টি আমরা জানতে পারি। এলাকার মানুষজন তাঁকে স্কুলে খুঁজতে এলে জাহানারা নামেই ডাকেন।তিনি আরও জানান, ওই শিক্ষকের বেতন চলমান রয়েছে।
নাঙ্গলকোট উপজেলা ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল ওহাব বলেন,উনার বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ হয়েছিলো।অভিযোগের প্রেক্ষিতে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সহ আমরা তদন্ত করেছি।তদন্তের রিপোর্ট জেলায় পাঠিয়ে দিয়েছি। পরে উনার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে,মামলার শুনানী হয়েছে।আগের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বদলি হওয়ায় মামলাটি এমনি পড়ে আছে।
নাঙ্গলকোট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আবু রায়হান বলেন,বিষয়টি আপনারা মাধ্যমে জেনেছি।প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সাথে কথা বলে বিস্তারিত জেনে পরে আপনাকে জানাবো।
কুমিল্লা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনছুর আলী চৌধুরী বলেন, বিষয়টি আমি জেনেছি। নতুন করে আবার তদন্ত করব। তাঁর সার্টিফিকেট সঠিক আছে কি না, সেটি যাচাই করতে তিন সদস্যের কমিটি করে দিচ্ছি। তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিভাগীয় উপপরিচালক নুরুল ইসলাম বলেন,আমি জেনেছি বিভাগীয় একটি মামলা হয়েছে।জেলা থেকে খবর নেন উনি কি করেছে।এটাতো উনাই দায়িত্ব।
কালের সমাজ/এসআর

