শরতের নীল আকাশে শুভ্র মেঘের মেলা, আর মধুমতি নদীর পূর্বতীরে কাশবনের চঞ্চল নাচনে নেমে এসেছে এক মোহময় রূপের ক্যানভাস। কিন্তু নদীর এই নিসর্গ শুধু দর্শনার্থীর চোখ জুড়ানোর স্থান নয়; এটি মাগুরার মহম্মদপুরের শতাধিক মৎস্যজীবীর আজন্ম বেঁচে থাকার রণক্ষেত্রও বটে। সেই আবহমান বাংলার গ্রামীণ আবহকে ধারণ করে নদীর বুকে ভেসে চলেছে লাল, নীল, বেগুনি, হলুদ আর বাহারি রঙের পালতোলা নৌকা। উদ্দেশ্য একটিই, পদ্মার শাখা মধুমতি নদী থেকে কাঙ্খিত ‘রূপালী ইলিশ’ আহরণ। শুধু পেশাদার জেলেরা নয়, শখের বশে অনেকে সৌখিন মানুষও পালের নৌকায় ইলিশ আহরণে নেমে উচ্ছ্বসিত হন। আধুনিক ইঞ্জিনচালিত ট্রলারের গর্জনের ভিড়ে মধুমতির বুকে রঙিন পাল তুলে ছুটে চলার দৃশ্যটি যেমন দৃষ্টিনন্দন, তেমনই নদী কেন্দ্রিক লোকসংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল। প্রতিকূল বাতাসকে বশ করে কেবল রশি, নানান রঙের কাপড় আর পুরনো শাড়ির টুকরোয় সেলাই করা পাল উড়িয়ে জেলেরা ছুটে চলেন দূর-দূরান্তে। ভাটিয়ালি আর জারি গানের সুর ভাঁজতে ভাঁজতে যখন তারা নদীতে জাল বিছিয়ে দেন, তখন থমকে থাকা সময়ও যেন নদীতরঙ্গে মেতে ওঠে। শরতের এমন শান্ত-স্নিগ্ধ নদী আর তার বুকে রঙিন পালের ডানায় ভর করে চলা জেলেদের দেখতে প্রতিদিন মধুমতি নদীর তীরে জমছে প্রকৃতিপ্রেমীদের ভিড়। শহরের ব্যস্ততা ছেড়ে একটু মুক্ত হাওয়া আর আবহমান গ্রাম-বাংলার সৌন্দর্য অবলোকন করতে নদীর পাড়ে সমাগম ঘটে নানা বয়সের মানুষের। তবে এই সুন্দর ও মোহময় দৃশ্যের নেপথ্যে রয়েছে কষ্টের দীর্ঘশ্বাস। ইলিশের মৌসুমে নদীর বুকে প্রায় একশটিরও বেশি নৌকা নামলেও জেলেদের জালে প্রত্যাশিত ইলিশ মিলছে না। ছোট আকারের কয়েক জোড়া ইলিশ মাছ পাচ্ছেন জেলেরা। সময় ও শারীরিক কষ্টের তুলনায় প্রাপ্তির পাল্লাটা অনেকটাই হালকা। তবে সারা বিকেল শেষে সন্ধ্যা নামার আগে সারিবদ্ধ পাল তোলা নৌকার তীরে ভেড়ার দৃশ্যটি নস্টালজিক-রোমাঞ্চকর অনুভূতি জোগায়। স্থানীয় জেলেরা জানান, আগে এই মধুমতিতে জাল ফেললেই প্রচুর ইলিশ উঠতো। এখন মাছের আনাগোনা কমে গেছে। তবুও বাপ-দাদার এই পেশা আকড়ে ধরে রোজ নদীতে আসি। দিন শেষে যা পাই, তা বিক্রি করেই কোনো মতে চলে সংসারের চাকা।” প্রকৃতির নিয়ম মেনে বদলে যাওয়া সময়েও মধুমতি ও তার তীরের জেলেদের সম্পর্ক আজও অটুট। অনিশ্চিত উপার্জনের মাঝেও রঙিন পাল উড়িয়ে স্বপ্ন দেখার এই ঐতিহ্য টিকে থাকুক বাঙালির হৃদয়েজুড়ে। মহম্মদপুরের নদীপাড়ের বাতাসে আজ সেই প্রত্যাশার সুরই ভাসছে।
কালের সমাজ/কে.পি

