নোয়াখালীর কবিরহাট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের পুরো ভবনজুড়ে এখন কেবলই জরাজীর্ণতা ও ধ্বংসের ছাপ। চারপাশের দেয়াল, পিলার ও ছাদজুড়ে তৈরি হয়েছে বিশালাকার গভীর ফাটল। ক্ষয়ে যাওয়া পলেস্তারা খসে পড়ছে প্রতিনিয়ত; এমনকি কিছু স্থানে মূল পিলার থেকে দেয়াল বিচ্ছিন্ন হয়ে ধসে পড়ার তীব্র ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এমন এক ভগ্নস্তূপ ও মৃত্যুফাঁদে পরিণত হওয়া ভবনেই প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলছে সরকারি সেবা কার্যক্রম। ফলে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের ট্রাজেডির আশঙ্কায় চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ।
স্থানীয় ও অফিস সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৮ সালে ভবনটি নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে ভবনের ছাদের বিভিন্ন অংশ খসে পড়ে ভেতরের লোহার রড ও কাঠামো উন্মুক্ত হয়ে গেছে। সরকারি এই গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয়ে প্রতিদিন জমি-জমা নিবন্ধনসহ নানা জরুরি কাজে দূর-দূরান্ত থেকে আসেন শত শত মানুষ। কিন্তু বাধ্য হয়ে তাদের ঘণ্টা পর ঘণ্টা সময় কাটাতে হচ্ছে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও জরাজীর্ণ এই ছাদের নিচে। মাথায় ছাদ ধসে পড়ার তীব্র আতঙ্ক থাকা সত্ত্বেও কেবল পেশাগত বাধ্যবাধকতার কারণে জীবন বাজি রেখে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
অফিসের কর্মচারীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কাজ করাটা দিন দিন অসম্ভব হয়ে উঠছে। অন্যদিকে সেবাগ্রহীতারাও একই শঙ্কায় ভুগছেন।
দূর-দূরান্ত থেকে আসা কয়েকজন সেবাগ্রহীতা তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “সরকারি সেবা নিতে এসে এভাবে জীবন বাজি রাখতে হবে কেন? কোনো বড় ধরনের প্রাণহানি বা রক্তক্ষয়ী ট্রাজেডি ঘটার পরই কি কর্তৃপক্ষের ঘুম ভাঙবে? আমরা চাই যেকোনো অঘটন ঘটার আগেই সরকার অনতিবিলম্বে এ বিষয়ে কঠোর ও চূড়ান্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করুক।”
নারী কর্মচারীরা জানান, কেবল জরাজীর্ণ ভবনই নয়, অফিসের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ কর্মবান্ধব না হওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নারী কর্মীরা। তাঁদের জন্য নেই কোনো পৃথক ওয়াশরুম, কমনরুম কিংবা বিশ্রামাগার। বাধ্য হয়ে অনেক নারী কর্মী তাঁদের কোমলমতি শিশুদের সঙ্গে নিয়েই এই ঝুঁকিপূর্ণ ও ঘিঞ্জি পরিবেশে দিনভর কাজ করছেন। পাশাপাশি তীব্র জায়গা ও কক্ষসংকটের কারণে দাপ্তরিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ব্যাহত হচ্ছে সেবার সার্বিক গুণগত মান।
জানা গেছে, ২০২৪ সালেই এই সাব-রেজিস্ট্রার অফিস ভবনটিকে ‘চরম ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট বিভাগে প্রতিবেদন পাঠানো হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালেও নতুন ভবন নির্মাণের জন্য অন্তত ৬০ শতাংশ জমি রয়েছে মর্মে বিষয়টি পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়।
সার্বিক বিষয়ে নোয়াখালীর সদর সাব-রেজিস্ট্রার ও অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা জেলা রেজিস্টার বুলবুল আহমেদ জানান, ভবনটি গণপূর্ত বিভাগের অধীনে রয়েছে। তারা ইতোমধ্যে গণপূর্ত বিভাগ এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করেছেন। যেকোনো অপ্রীতিকর ট্রাজেডি ঘটার আগেই জরুরি ভিত্তিতে আপাতত কোনো ভাড়া করা স্থানে অফিস স্থানান্তরের চিন্তাভাবনা চলছে।
মাথার ওপর ছাদ ধসে পড়ার প্রত্যক্ষ শঙ্কা নিয়েই প্রতিদিন চলছে কবিরহাট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কার্যক্রম। কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সেবাগ্রহীতা—সকলেরই এখন জোর দাবি, বড় কোনো দুর্ঘটনার অপেক্ষায় না থেকে অনতিবিলম্বে এই কার্যালয়টি কোনো নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হোক এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেখানে একটি নতুন ভবন নির্মাণ করা হোক।
কালের সমাজ/কে.পি

