১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেটের আকার ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা। এ বাজেট দিয়েছিলেন দেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা প্রত্যয় নিয়ে আজ বৃহস্পতিবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সম্ভাব্য প্রস্তাবিত বাজেট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা উত্থাপন করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। প্রথম বাজেটের তুলনায় যা বাড়ছে ১,১৯৩ গুণ।
২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। এরপর দেশি-বিদেশি নানা চক্রান্ত ও বিতর্কিত নির্বাচনসহ নানা পন্থায় বিএনপিকে ১৯ বছরের বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে রাখা হয়। এই অবস্থায় গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশভাবে বিজয়ী লাভ করে তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন বিএনপি।
১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার পরিচালিত হয়ে আসছে। এই সরকারের এটি প্রথম বাজেট।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) ও বাংলাদেশ বেতারে জাতির সামনে আজ পেশ করার কথা রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে বাজেট উপস্থাপনকারী হিসেবে আমির খসরু ১৬তম ব্যক্তি হতে যাচ্ছেন। বিএনপির তরফ থেকে জানা যায়, বীর চট্টলার প্রথম ব্যক্তি, যিনি জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন।
এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বৈষম্যহীন ও টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ার প্রত্যয় নিয়ে প্রায় ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। যা ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটের তুলনায় ৭ হাজার কোটি টাকা কম। অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে বাজেট উপস্থাপনকারী হিসেবে সালেহউদ্দিন আহমেদ ১৫ তম ব্যক্তি। তার পৈত্রিক বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়।
বাংলদেশের ইতিহাসে ১২ বার করে বাজেট পেশ করে রেকর্ড গড়েছেন সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান ও আবুল মাল আবদুল মুহিত। সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসন আমলে সাইফুর রহমান এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট এইচএম এরশাদ ও শেখ হাসিনার শাসন আমলে আবদুল মুহিত এসব বাজেট পেশ করেন। অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া ৬ বার বাজেট পেশ করেছেন। তাদের সবার বাড়ি সিলেটে এবং তারা তিনজন মিলে ৩০ বার বাজেট পেশ করেন।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেট দিয়েছিলেন দেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। একই সঙ্গে তিনি দুই অর্থবছরের বাজেট দিয়েছিলেন। এর আগে মুজিবনগর সরকার ১৯৭১ সালের ১৯ জুলাই দৈনন্দিন ও অপরিহার্য ব্যয় নির্বাহে একটি বাজেট পেশ করেছিল। যার রাজস্ব আয় ৭,৭৪, ১৮,৯৯৮ টাকা, ব্যয় ৮,৬২, ৪৮,২০৪ টাকা। বাজেট ঘাটতি ৮৮,২৯, ২০৬ টাকা। তখন অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন এম মনসুর আলী। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এর অনুমোদন দিয়েছিলেন। সব মিলিয়ে ২১ জন ছিলেন অর্থমন্ত্রী বা অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা। তাদের মধ্যে ১৫ জন ৫৪টি বাজেট দিয়েছেন। ১১ জুন নতুন বাজেট দিতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি হবেন বাজেট দেওয়া ১৬তম ব্যক্তি।
অর্থমন্ত্রী ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদ ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে ৭৮৬ কোটি টাকা, ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে ৯৯৫ কোটি টাকা, ১৯৭৪-৭৫ অর্থবছরে ১০৮৪.৩৭ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেন। ড. আজিজুর রহমান মল্লিক (এ আর মল্লিক) ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরে ১৫৪৯.১৯ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেন।
জিয়াউর রহমান ১৯৭৬-৭৭ অর্থবছরে ১৯৮৯.৮৭ কোটি টাকা ও ১৯৭৭-৭৮ অর্থবছরে ২১৮৪ কোটি টাকা, ১৯৭৮-৭৯ অর্থবছরে ২৪৯৯ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেন। ড. এম এন হুদা ১৯৭৯-৮০ অর্থবছরে ৩৩১৭ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেন। সাইফুর রহমান ১৯৮০-৮১ অর্থবছরে ৪১০৮ কোটি টাকা, ১৯৮১-৮২ অর্থবছরে ৪৬৭৭ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেন। আবদুল মুহিত ১৯৮২-৮৩ অর্থবছরে ৪৭৩৮ কোটি টাকা, ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরে ৫৮৯৬ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেন। এম সাইদুজ্জামান ১৯৮৪-৮৫ অর্থবছরে ৬৬৯৯ কোটি টাকা, ১৯৮৫-৮৬ অর্থবছরে ৭১৩৮ কোটি টাকা, ১৯৮৬-৮৭ অর্থবছরে ৮৫০৪ কোটি টাকা, ১৯৮৭-৮৮ অর্থবছরে ৮৫২৭ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেন। ১৯৮৮-৮৯ অর্থবছরে ১০৫৬৫ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেন মেজর জেনারেল (অব.) মুনিম। ১৯৮৯-৯০ অর্থবছরে ড. ওয়াহিদুল হক ১২৭০৩ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেন। ১৯৯০-৯১ অর্থবছরে মেজর জেনারেল (অব) মুনিম ১২৯৬০ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেন।
সাইফুর রহমান ১৯৯১-৯২ অর্থবছরে ১৫৫৮৪ কোটি টাকা, ১৯৯২-৯৩ অর্থবছরে ১৭৬০৭ কোটি টাকা, ১৯৯৩-৯৪ অর্থবছরে ১৯০৫০ কোটি টাকা, ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছরে ২০৯৪৮ কোটি টাকা, ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরে ২৩১৭০ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেন। শাহ এএমএস কিবরিয়া ১৯৯৬-৯৭অর্থবছরে ২৪৬০৩ কোটি টাকা, ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে ২৭৭৮৬ কোটি টাকা, ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে ২৯৫৩৭কোটি টাকা, ১৯৯৯-০০ অর্থবছরে ৩৪২৫২ কোটি টাকা, ২০০০-০১ অর্থবছরে ৩৮৫২৪ কোটি টাকা, ২০০১-০২ অর্থবছরে ৪২৩০৬ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেন। সাইফুর রহমান ২০০২-০৩ অর্থবছরে ৪৪৮৫৪ কোটি টাকা, ২০০৩-০৪ অর্থবছরে ৫১৯৮০ কোটি টাকা, ২০০৪-০৫ অর্থবছরে ৫৭২৪৮ কোটি টাকা, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ৬১০৫৮ কোটি টাকা, ২০০৬-০৭ অর্থবছরে ৬৯৭৪০ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেন। এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ৯৯৯৬২ কোটি টাকা, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ৯৯৯৬২ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেন।
আবদুল মুহিত ২০০৯-১০ অর্থবছরে ১১৩,৮১৫ কোটি টাকা, ২০১০-১১ অর্থবছরে ১৩২,১৭০ কোটি টাকা, ২০১১-১২ অর্থবছরে ১৬৫,০০০ কোটি টাকা, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১৯১,৭৩৮ কোটি টাকা, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ২ লাখ ৫০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪ লাখ ২৭০ কোটি টাকা, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেন।
আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেন। আবুল হাসান মাহমুদ আলী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করলেন। এই বাজেট পেশের দুই মাসের মধ্যে (৫ আগস্ট) পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের। এই বাজেট বাস্তবায়নের দায়িত্ব অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে পড়লেও তা অপরিবর্তিত রাখা হয়। তবে, উন্নয়ন ব্যয় সংযতসহ অনেক প্রকল্পের বাস্তবায়ন পিছিয়ে দেওয়া হয়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে গত ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে বাজেট পেশ করেন অর্থ উপদেষ্টা সাবেক গভর্ণর সালেহউদ্দিন আহমেদ। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর হিসেবে দায়িত্বপালন করা, তিনি-ই প্রথম বাজেট উপস্থাপনকারী। সর্বশেষ অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে ২০২৬-২৭ অর্থ বছরের জন্য সম্ভাব্য বাজেট পেশ করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
কালের সমাজ//আরআই

