ঢাকা মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
রিজার্ভ চুরির ঘটনায় আলোচিত নাম

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরীর ৩ বছরের কারাদন্ড

কালের সমাজ ডেস্ক | জুলাই ২৮, ২০২৬, ১১:৫৭ এএম কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরীর ৩ বছরের কারাদন্ড
এস কে সুর ফাইল ছবি

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর সিতাংশু কুমার সুর ওরফে এস কে সুর চৌধুরী সম্পদের হিসাব বিবরণী নির্ধারিত সময়ে দাখিল না করায় তিন বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। মঙ্গলবার ঢাকার দ্বিতীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক আয়েশা নাসরিন এ রায় ঘোষণা করেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলায় দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে এই রায় আসে। রায় ঘোষণার পর আদালতে উপস্থিত এস কে সুর বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, তিন বছরের সাজা! এই মামলায় না এক বছরের সাজা?” এরপর আদালত সাজা পরোয়ানা জারি করলে তাকে পুনরায় কেরাণীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।

রায় ঘোষণার দিন সকালে তাকে কেরাণীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আদালতে আনা হয়। প্রথমে মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় রাখা হয় এবং পরে তাকে আদালতের এজলাসে হাজির করা হয়। বিচারক রায় ঘোষণার সময় তাকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে সম্পদের হিসাব বিবরণী দাখিল না করায় দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় তাকে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

এর আগে গত ১৫ জুলাই মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়। সেদিন দুদকের কৌঁসুলি আবুল কালাম আজাদ আদালতের কাছে আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি, অর্থাৎ তিন বছরের কারাদণ্ডের আবেদন জানান। অপরদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী সরোজ কুমার হাওলাদার দাবি করেন, তার মক্কেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি এবং তাকে খালাস দেওয়া উচিত। উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে আদালত রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য করেছিলেন।

মামলার নথি অনুযায়ী, এস কে সুরের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের বাইরে সম্পদ বা সম্পত্তির মালিক হওয়ার অভিযোগের তদন্ত চলাকালে দুর্নীতি দমন কমিশন তাকে, তার স্ত্রী সুপর্ণা সুর চৌধুরী এবং তার ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের নামে বা বেনামে থাকা সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের বিবরণ, আয়ের উৎস, দায়-দেনা এবং সম্পদ অর্জনের বিস্তারিত তথ্য জমা দিতে নির্দেশ দেয়। গত বছরের ২৭ অক্টোবর তিনি নিজে সম্পদের হিসাব বিবরণীর ফরম গ্রহণ করেন এবং স্বাক্ষরের মাধ্যমে তা গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। কিন্তু আইন অনুযায়ী নির্ধারিত ২১ কার্যদিবসের মধ্যে তিনি সেই হিসাব বিবরণী দাখিল করেননি।

নির্ধারিত সময় অতিক্রম হওয়ার পর গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর দুদকের উপপরিচালক নাজমুল হুসাইন এস কে সুর, তার স্ত্রী সুপর্ণা সুর চৌধুরী এবং কন্যা নন্দিতা সুর চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। পরে মামলার তদন্ত শেষে দুদকের উপপরিচালক মো. আহসান উদ্দিন ২৫ আগস্ট অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এরপর গত বছরের ৬ নভেম্বর আদালত এস কে সুরের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করার নির্দেশ দেন। বিচার চলাকালে আদালত মোট সাতজন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। সাক্ষ্য-প্রমাণ, নথিপত্র এবং উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক পর্যালোচনা শেষে আদালত মঙ্গলবার এই রায় ঘোষণা করেন।

এস কে সুর ২০২৫ সালের ১৪ জানুয়ারি রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকা থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনের হাতে গ্রেপ্তার হন। এরপর থেকেই তিনি কারাগারে রয়েছেন। এই মামলার রায় তার বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এস কে সুর চৌধুরী ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংঘটিত বাংলাদেশ ব্যাংকের বহুল আলোচিত রিজার্ভ চুরির সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।  ২০১৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারির সেই ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়, যা দেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি হিসেবে পরিচিত। 

সে সময় ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে এস কে সুরও দায়িত্বে ছিলেন। পরবর্তীকালে বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদন ও আলোচিত খসড়া চার্জশিটে রিজার্ভ চুরির ঘটনার তথ্য গোপন রাখা, ঘটনার পর যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থতা এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীনতার বিষয় উঠে আসে। যদিও রিজার্ভ চুরির মামলার সঙ্গে এই সম্পদের হিসাব বিবরণী দাখিল না করার মামলার আইনগত বিষয় ভিন্ন, তবুও তার অতীত দায়িত্ব এবং ওই সময়কার ভূমিকার কারণে বর্তমান মামলাটিও ব্যাপক জনআলোচনার সৃষ্টি করেছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পদের হিসাব বিবরণী নির্ধারিত সময়ে দাখিল করা সরকারি কর্মকর্তা ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের জন্য একটি বাধ্যতামূলক আইনি দায়িত্ব। নির্ধারিত সময়ে সেই নির্দেশনা পালন না করলে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন অনুযায়ী ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। এস কে সুরের বিরুদ্ধে ঘোষিত এই রায় দুর্নীতি দমন সংক্রান্ত মামলায় আইনের প্রয়োগ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

কালের সমাজ/এএইচবি 

অর্থনীতি বিভাগের আরো খবর

Link copied!