ভারত থেকে বাংলাদেশে কথিত ‘পুশ-ইন’ ইস্যু নিয়ে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই দিল্লিতে চার দিনব্যাপী বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলন শেষ হয়েছে। সম্মেলনে সীমান্ত সহযোগিতা জোরদারে যৌথ টহল বৃদ্ধি, তাৎক্ষণিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী।
শুক্রবার প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে আলোচনাকে ‘আন্তরিক, ইতিবাচক ও দূরদর্শী’ বলে উল্লেখ করা হয়। বাংলাদেশের ১৪ সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। অপরদিকে ভারতের ১২ সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন বিএসএফ মহাপরিচালক প্রবীণ কুমার। উভয় পক্ষ আগামী নভেম্বরে ঢাকায় পরবর্তী মহাপরিচালক পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলন আয়োজনের বিষয়ে সম্মত হয়েছে।
সম্মেলনে মানব পাচার, সীমান্ত হত্যা, চোরাচালান, সীমান্ত অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। সীমান্তে শান্তি, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে যৌথ টহল জোরদার, নজরদারি বৃদ্ধি এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান পরিচালনার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ‘পুশ-ইন’ ইস্যুও বৈঠকে গুরুত্ব পায়। বিজিবি মহাপরিচালক রোহিঙ্গাসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে বাংলাদেশি পরিচয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এ ধরনের কার্যক্রম সীমান্ত বিষয়ক যৌথ নির্দেশিকা, সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা এবং বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় প্রটোকলের পরিপন্থি।
বিজিবি প্রধান জানান, কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশি হিসেবে যাচাইকৃত হলে প্রচলিত দ্বিপক্ষীয় প্রত্যাবাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত তাকে গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে তিনি এ ধরনের পুশ-ইন কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রক্রিয়া অনুসরণের আহ্বান জানান।
অন্যদিকে বিএসএফ মহাপরিচালক বাংলাদেশ সরকারের কাছে জাতীয়তা যাচাইকরণের অনিষ্পন্ন বিষয়গুলো দ্রুত নিষ্পত্তি এবং ভারতে অবস্থানরত ‘অবৈধ বাংলাদেশিদের’ দ্রুত প্রত্যাবাসনের আহ্বান জানান।
সীমান্ত হত্যা প্রসঙ্গেও উদ্বেগ জানায় বাংলাদেশ। বিজিবি মহাপরিচালক সীমান্তে বিএসএফ সদস্য ও ভারতীয় নাগরিকদের হাতে নিরস্ত্র বাংলাদেশিদের নিহত হওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং সীমান্ত এলাকায় হত্যা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান। তিনি মানবাধিকার সুরক্ষা, জবাবদিহিতা এবং সীমান্তে স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।

যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, উভয় দেশ নিজ নিজ নাগরিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত হত্যা ও হামলার ঘটনা তদন্ত করবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। পাশাপাশি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বিদ্যমান আইনি কাঠামোর আওতায় সমস্যাগুলোর সমাধানে কাজ করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়।
বৈঠকে নিরাপত্তা ইস্যুও গুরুত্ব পায়। বিজিবি মহাপরিচালক ভারতের মিজোরাম অঞ্চলে পার্বত্য এলাকার বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সম্ভাব্য অবস্থান এবং বাংলাদেশবিরোধী কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এ বিষয়ে ভারতের সহযোগিতা কামনা করলে বিএসএফ প্রধান জানান, ভারত সরকার জাতীয়তা নির্বিশেষে সব ধরনের সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করে এবং তাদের ভূখণ্ড কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের সুযোগ দেয় না।
এছাড়া উভয় পক্ষ নিজ নিজ দেশে সীমান্ত ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে মিথ্যা তথ্য, গুজব ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়েও একমত হয়েছে। দুই দেশের কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল তথ্য প্রচার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
কালের সমাজ/এ এ ইচবি

