হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল এক সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এলেও এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘পুরো নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে বলে ফের দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
অন্যদিকে ইরান এখনও প্রণালিটির ওপর নিজেদের প্রভাব বজায় রাখার কথা বলছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ না ওঠা পর্যন্ত স্বাভাবিকভাবে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেয়া হবে না বলে জানিয়েছে।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, বুধবার (১৩ আগস্ট) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে হরমুজের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকার দাবি করেন ট্রাম্প। এর আগের দিন সাংবাদিকদের কাছেও একই দাবি করেছিলেন তিনি।
এদিকে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেয়ার লক্ষ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা খুব একটা এগোচ্ছে না।
ট্রাম্প বলেন, ‘হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পুরো নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। আমার মনে হয়, আমরা এটি ধরে রাখব!’ তিনি আরও দাবি করেন, ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান অবরোধকে সবাই ‘ইস্পাতের প্রাচীর’ বলে অভিহিত করছে এবং এ বিষয়ে ইরানের কিছুই করার নেই।
ট্রাম্প বলেন, ‘ইরান শুধু কথাই বলে, কাজে কিছুই করে না। মধ্যপ্রাচ্যের সেই দাদাগিরি আর নেই’। পোস্টের শেষে তিনি লেখেন, ‘সকল প্রশংসা আল্লাহর!’
তবে ট্রাম্পের এমন দাবির মধ্যেও হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের প্রভাব বজায় রাখার কথা বলে আসছে ইরান। ভবিষ্যতে এই সমুদ্রপথ কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা করছে তেহরান। তবে এ আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র নেই। আর এর মধ্যেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে বৃহত্তর শান্তি আলোচনা অনেকটাই স্থবির হয়ে আছে।
ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে না নেয়া, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং জব্দ করা ইরানি সম্পদ অবমুক্ত না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিকভাবে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেবে না তেহরান।
অবশ্য কিছু জাহাজ এখনও প্রণালিটি দিয়ে চলাচল করতে পারছে। তবে তাদের বিভিন্ন বাধা ও বাড়তি নিরাপত্তাঝুঁকির মুখে পড়তে হচ্ছে। ফলে এই সমুদ্রপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলের পরিমাণ ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র আটটি জাহাজ চলাচল করেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে যেখানে প্রতিদিন ১৩০ থেকে ১৪০টি জাহাজ চলাচল করত, তার তুলনায় এটি অনেক কম। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, আগের ১০ দিনের গড় জাহাজা চলাচলের সংখ্যা ছিল প্রায় ১২টি জাহাজ।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি। যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতা স্মারক বা এমওইউতে সই করেছিল। তবে জুলাইয়ের মাঝামাঝি সেই সমঝোতা ভেঙে যায় এবং দুই পক্ষ আবার হামলা শুরু করে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা তুলনামূলকভাবে কমেছে, তবে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে গত মঙ্গলবার পানামার পতাকাবাহী একটি পণ্যবাহী জাহাজে মার্কিন নৌবাহিনীর সামরিক হেলিকপ্টার হামলা চালায়।
এদিকে ইয়েমেনভিত্তিক হুথিরাও যুদ্ধে নতুন করে একটি ফ্রন্ট খুলেছে। তারা বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজে হামলা চালাচ্ছে। মঙ্গলবার মিশরের মালিকানাধীন একটি জাহাজে হুথিদের হামলায় ছয়জন নিহত হয়েছেন। এ ধরনের হামলায় এটিই প্রথম প্রাণহানির ঘটনা।
এমন অবস্থায় বুধবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি বলেন, ইসলামাবাদ ‘দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসাতে’ এবং শান্তি প্রক্রিয়া ব্যাহত করার যেকোনও প্রচেষ্টা ঠেকাতে কাজ করছে। তিনি জানান, ১০ আগস্ট পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ইরান, সৌদি আরব ও কুয়েতের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভিও তেহরান সফর করছেন।
অবশ্য শান্তি আলোচনা তেমন এগোতে না পারলেও ট্রাম্প প্রশাসন বারবার যুদ্ধ বন্ধের পথ খুঁজতে আগ্রহ প্রকাশ করছে। আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধটি দেশটিতে ক্রমেই বোঝা হয়ে উঠছে।
কিছু বিশ্লেষকের মতে, ট্রাম্পের সর্বশেষ বক্তব্য যুদ্ধকে বিজয় হিসেবে তুলে ধরার একটি সমন্বিত প্রচেষ্টার অংশ। কারণ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির প্রভাব কমানো এবং বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তন আনার যে লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছিল, তার কোনোটিই পুরোপুরি অর্জিত হয়নি।
ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক ডেনিস সিট্রিনোভিচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে লেখেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে, যেকোনও মূল্যে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘জয়ী’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা এমন একটি কৃত্রিম বাস্তবতা তৈরি করছে, যা প্রশাসন ও প্রেসিডেন্টকে বাস্তব পরিস্থিতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া থেকে দূরে রাখছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নেই। এত কিছু ঘটার পরও প্রণালি দিয়ে সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার মতো যথেষ্ট সক্ষমতা ইরানের রয়েছে।’
মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইটের মঙ্গলবারের একটি বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। তিনি বলেছিলেন, ‘হরমুজ প্রণালি দিয়ে গত সাত দিনের গড়ে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৯০ লাখ ব্যারেল তেল বের হচ্ছে’। রাইটের দাবি, স্থলপথে জ্বালানি পরিবহনের অবকাঠামো উন্নত হওয়ায় অঞ্চলটি থেকে জীবাশ্ম জ্বালানি সরবরাহ যুদ্ধ শুরুর আগের মাত্রার কাছাকাছি রয়েছে।
তবে অবসিডিয়ান রিস্ক অ্যাডভাইজর্সের বিশ্লেষক ব্রেট এরিকসন এক্সে দেয়া পোস্টে বলেন, প্রতিদিন হরমুজ প্রণালি দিয়ে ৯০ লাখ ব্যারেল তেল বের হচ্ছে—এমন কোনও প্রমাণ নেই। তিনি আরও বলেন, ‘এমন প্রমাণ একেবারেই শূন্য। ‘হয়তো’ নয়, ‘সম্ভবত’ও নয়।’
কালের সমাজ/এসআর

