ঢাকা রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩

সিনেটে প্রথম মিশরীয় মুসলিম এল-সায়েদ, প্রচারণায় ওবামা

কালের সমাজ ডেস্ক | অক্টোবর ২৫, ২০২৬, ০১:০৩ পিএম সিনেটে প্রথম মিশরীয় মুসলিম এল-সায়েদ, প্রচারণায় ওবামা

যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে সিনেট ও গভর্নর পদে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী প্রথম মিশরীয় মুসলিম আবদুল এল-সায়েদ পক্ষে ভোট চাইলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। এ সময় উপস্থিত ছিল হাজারো মার্কিনী। এ সময় বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনাও করেন তিনি। 

শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সিনেট প্রার্থী এল-সায়েদের সমর্থনে নির্বাচনী জনসভায় অংশ নিয়ে তিনি ডেট্রয়েটের ক্যাস টেকনিক্যাল হাইস্কুলে আয়োজিত এ সমাবেশে হাজারো মানুষের সামনে এল-সায়েদের পক্ষে বক্তব্য দেন।

সমাবেশে ওবামা বলেন, এল-সায়েদ ‘পরিবর্তনের জন্য লড়াই করছেন—প্রকৃত পরিবর্তন, যা রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব কমাবে এবং মানুষের পকেটে অর্থ ফিরিয়ে দেবে।’

স্বাস্থ্যসেবা প্রসঙ্গে ওবামা বলেন, ‘অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্টের মাধ্যমে আমরা যে কাজ শুরু করেছিলাম, তিনি তা শেষ করবেন এবং প্রত্যেক মার্কিন নাগরিকের জন্য মানসম্মত ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবেন।’

মিশিগানে আগাম ভোট গ্রহণ শুরুর দিনেই এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ৩ নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে উৎসাহিত করাই ছিল প্রচার কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য।

ট্রাম্পের সমালোচনায় সরব ওবামা
সমাবেশে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ট্রাম্প নিজে ও তার পরিবারকে সম্পদশালী করার অভিযোগ তোলেন ওবামা। তার দাবি, বর্তমান প্রশাসন ক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে সুযোগ-সুবিধা গ্রহণের একটি সংস্কৃতি তৈরি করেছে।

ওবামা বলেন, ‘কোনো প্রেসিডেন্টকে এভাবে সুযোগ-সুবিধা নিতে এতটা আগ্রহী আগে কখনো দেখিনি।’

প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকেও বিদ্রূপ করেন সাবেক এই প্রেসিডেন্ট। তার ভাষায়, হেগসেথ সেনাদের ‘চোয়ালের গড়ন ও টেস্টোস্টেরনের মাত্রা’ নিয়ে ‘ভীষণ ব্যস্ত’। এরপর তিনি প্রশ্ন করেন, ‘আপনারা কী মনে করেন, এই লোকটি প্রতিদিন আয়নার সামনে কতটা সময় কাটান?’

ট্রাম্পের শুল্কনীতি নিয়েও কৌতুক করেন ওবামা। কানাডার প্রতি ট্রাম্পের কঠোর অবস্থানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘এই মানুষগুলোই আমাদের মার্টিন শর্ট আর ম্যাপল সিরাপ উপহার দিয়েছে।’

হোয়াইট হাউসের সংস্কারকাজ নিয়েও ট্রাম্পকে কটাক্ষ করেন ওবামা। বলরুম ও রোজ গার্ডেনের সংস্কারের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘তার এইচজিটিভিতে কাজ করা উচিত।’ এরপর তিনি বলেন, ‘তিনি হোয়াইট হাউসের চেহারা এমন করে ফেলেছেন, যেন সাদ্দাম হোসেন একটা চিজকেক ফ্যাক্টরি খুলেছেন।’

এল-সায়েদকে সমর্থন নিয়ে আগে থেকেই ছিল প্রশ্ন
এল-সায়েদের প্রতি ওবামা সমর্থন জানাবেন কি না, তা নিয়ে আগে থেকেই জল্পনা ছিল। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি ‘মেডিকেয়ার ফর অল’-এর সমর্থক এল-সায়েদ একসময় ওবামার প্রেসিডেন্সির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ অর্জন অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্টকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত একটি সীমিত সংস্কার বলে মন্তব্য করেছিলেন।

আগস্টে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রাথমিক নির্বাচনে মধ্যপন্থী কংগ্রেস সদস্য হ্যালি স্টিভেন্সকে পরাজিত করেন চিকিৎসক ও ওয়েইন কাউন্টির সাবেক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এল-সায়েদ। স্টিভেন্স ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রভাবশালী মহল এবং ইসরায়েলপন্থী সংগঠনগুলোর সমর্থন পেয়েছিলেন।

প্রাথমিক নির্বাচনের পর ওবামা ও এল-সায়েদের মধ্যে ফোনে কথা হয়। এরপর এল-সায়েদ সাবেক প্রেসিডেন্টকে তার পরামর্শদাতা হিসেবে উল্লেখ করেন। শনিবারের সমাবেশের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে এল-সায়েদের প্রতি সমর্থন জানালেন ওবামা।

এল-সায়েদের সঙ্গে মতপার্থক্যের প্রসঙ্গে ওবামা নিজের স্ত্রীর দ্বিমত হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘প্রতিটি বিষয়ে প্রতিটি খুঁটিনাটি নিয়ে আমরা একমত হব না। জানেন, আমার সব কাজের সঙ্গে আর কে একমত নন? মিশেল ওবামা।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই সমাজে প্রত্যেক মানুষ যাতে ন্যায্য সুযোগ পায়, তা নিশ্চিত কতে আমাদের  মূল্যবোধ অভিন্ন। আর ব্যবস্থাটি যেন শুধু সমাজের শীর্ষে থাকা মানুষদের স্বার্থে পরিচালিত না হয়, সেটিও আমরা চাই।’

মিশিগানের সিনেট আসন নিয়ে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা
মিশিগানের সিনেট আসনটি এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। গত ২৫ বছরে অঙ্গরাজ্যটির কোনো সিনেট আসনে জয় পায়নি রিপাবলিকান পার্টি। তবে এবার যে আসনগুলো নিজেদের দখলে নেওয়ার সম্ভাবনা দেখছে দলটি, তার মধ্যে মিশিগানও রয়েছে।

এল-সায়েদের প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স সাবেক কংগ্রেস সদস্য এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থনপুষ্ট। ২০২৪ সালের সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট সিনেটর এলিসা স্লটকিনের কাছে অর্ধশতাংশেরও কম ব্যবধানে হেরেছিলেন রজার্স।

কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের মূল্যায়নে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা এমন একটি নির্বাচন, যেখানে দুই প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনা প্রায় সমান।

সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে স্লটকিন বলেন, ‘মিশিগান লড়াকু প্রার্থীদের নির্বাচিত করায় বিশ্বাস করে।’ এল-সায়েদের সঙ্গে তার মতপার্থক্য থাকলেও তিনি বলেন, ‘এটা ঠিক আছে, কারণ আরও অনেক বেশি বিষয়ে আমরা একমত।’

স্লটকিন আরও বলেন, ‘হোয়াইট হাউসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করছি আমরা।’

অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে রাজ্যজুড়ে সম্ভাব্য ভোটারদের নিয়ে পরিচালিত মারিস্টের এক জরিপে এল-সায়েদ ৫০ শতাংশ এবং রজার্স ৪৮ শতাংশ সমর্থন পান। ব্যবধানটি ছিল জরিপের ত্রুটিসীমার মধ্যে। একই সময়ের কাছাকাছি রিয়েলক্লিয়ারপলিটিকসের বিভিন্ন জরিপের গড় হিসাবে এল-সায়েদ প্রায় ২ দশমিক ৬ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন।

ট্রাম্পের আক্রমণ ও এল-সায়েদকে ঘিরে বিতর্ক
নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প বারবার এল-সায়েদকে আক্রমণ করেছেন। তাঁর মধ্যনামের উল্লেখ করে ট্রাম্প তাঁকে ‘জিহাদি’ বলে অভিহিত করেছেন এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগ তুলেছেন। এল-সায়েদ এসব অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করেছেন। এ নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মধ্যপন্থী অংশ থেকেও সমালোচনার মুখে পড়েছেন এল-সায়েদ। বামপন্থী অনলাইন স্ট্রিমার হাসান পাইকারের সঙ্গে তার উপস্থিতি এ সমালোচনার অন্যতম কারণ।

রোববার মিশিগান সফরে যাওয়ার কথা ট্রাম্পের। কানাডা সীমান্তের কাছে পোর্ট হুরনে অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকানদের সমর্থনে সমাবেশ করার কথা রয়েছে তার। শহর কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, সেন্ট ক্লেয়ার কাউন্টিতে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের এটিই হবে প্রথম সফর।

নির্বাচিত হলে এল-সায়েদ হবেন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের প্রথম মুসলিম এবং প্রথম মিশরীয়-আমেরিকান সদস্য।

গভর্নর পদেও গুরুত্বপূর্ণ লড়াই
মিশিগানের গভর্নর পদে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জোসেলিন বেনসনের প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য জন জেমস। জেমস নির্বাচিত হলে তিনি হবেন অঙ্গরাজ্যটির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ গভর্নর।

ডেট্রয়েটের সমাবেশে বেনসনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ভোটারদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান ওবামা। দিনের শুরুতে ওহাইওর ক্লিভল্যান্ডেও প্রচার চালান তিনি। সেখানে সাবেক ওহাইও সিনেটর শেরড ব্রাউন এবং গভর্নর পদে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যামি অ্যাক্টনের পক্ষে বক্তব্য দেন। ওই সমাবেশেও হোয়াইট হাউস ও রিপাবলিকান পার্টির সমালোচনা করেন সাবেক প্রেসিডেন্ট।

মিশিগানে তার এই সফর মধ্যবর্তী নির্বাচনে সশরীরে প্রচারে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে সপ্তাহান্তের প্রথম কর্মসূচি ছিল।

ডেট্রয়েটে এল-সায়েদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ
ডেট্রয়েটের প্রধান শহর ওয়েইন কাউন্টিতে এল-সায়েদের সামনে এখনো কঠিন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আগস্টের প্রাথমিক নির্বাচনে এই কাউন্টিতে স্টিভেন্স প্রায় ৫১ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। বিপরীতে এল-সায়েদের ভোট ছিল ৪৫ শতাংশ।

ডেট্রয়েটের তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি বাসিন্দা কৃষ্ণাঙ্গ। ২০২৪ সালের অক্টোবরে কমলা হ্যারিসের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে সর্বশেষ শহরটিতে গিয়েছিলেন ওবামা। গত মাসে ডেট্রয়েটে এল-সায়েদের সঙ্গে প্রচারে অংশ নিয়েছিলেন হ্যারিসও।

শনিবারের সমাবেশে ওবামা মূলত স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কমানো, রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব হ্রাস এবং সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। এল-সায়েদের সঙ্গে নীতিগত মতপার্থক্য স্বীকার করেও তিনি বলেন, সমাজের সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা এবং ক্ষমতা ও সম্পদের কেন্দ্রীকরণ ঠেকানোর প্রশ্নে তাদের মূল্যবোধ অভিন্ন। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান 

কালের সমাজ/এসআর

Link copied!