দেশের পোল্ট্রি খাতকে আরো আধুনিক, নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই ভিত্তির ওপর গড়ে তুলতে ‘জাতীয় পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালা-২০২৬’ প্রণয়ন করেছে সরকার।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় প্রণীত এ নীতিমালায় উৎপাদন বৃদ্ধি, রোগ নিয়ন্ত্রণ, বাজার ব্যবস্থাপনা, মান নিয়ন্ত্রণ, গবেষণা সম্প্রসারণ এবং রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে তোলার বিষয়ে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের নিবন্ধন ছাড়া কোনো বাণিজ্যিক খামার স্থাপন করা যাবে না।
দীর্ঘ ১৮ বছর পর ২০০৮ সালের নীতিমালার প্রয়োজনীয় সংশোধন ও হালনাগাদ করে গত রোববার নতুন এই নীতিমালা প্রকাশ করা হয়েছে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশের প্রাণিজ আমিষের অন্যতম প্রধান উৎস পোল্ট্রি খাত। ডিম ও মাংস উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এ খাত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
বিশেষ করে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করতেও পোল্ট্রি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
নতুন নীতিমালার মূল লক্ষ্য হলো— দেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণ, নিরাপদ ও মানসম্মত ডিম-মাংস উৎপাদন বৃদ্ধি, বাজার স্থিতিশীল রাখা, খামারিদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন রপ্তানিযোগ্য পোল্ট্রি শিল্প গড়ে তোলা।
একই সঙ্গে জলবায়ু সহনশীল জাত উদ্ভাবন, দেশীয় জিনগত বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার ওপরও বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
নীতিমালা অনুযায়ী, প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে ডিম, মাংস ও অন্যান্য পোল্ট্রিজাত পণ্যের উৎপাদন বাড়ানো হবে।
পোল্ট্রি খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, ক্ষতিকর খাদ্য উপাদানের ব্যবহার বন্ধ, উন্নত জাত উদ্ভাবন এবং দেশীয় প্রজাতির সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
এছাড়া পোল্ট্রি উৎপাদনে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর লক্ষ্যে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করতে নীতিমালায় মানসম্মত টিকা ও ওষুধ উৎপাদন এবং সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় পর্যায়ে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা সুবিধা সম্প্রসারণ, নতুন ও পুনরায় আবির্ভূত রোগ শনাক্তকরণ এবং আধুনিক রোগ নজরদারি ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
একই সঙ্গে পোল্ট্রি খাদ্যে অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা এবং নিষিদ্ধ ও নিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিকের তালিকা প্রকাশের বিধান রাখা হয়েছে।
পোল্ট্রি খাতে উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকেও নীতিমালার অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ভূমিহীন, প্রান্তিক কৃষক, শিক্ষিত যুবক ও নারীদের পোল্ট্রি খামার স্থাপনে উৎসাহিত করা হবে। পাশাপাশি জীব-নিরাপত্তা নিশ্চিত করে পরিবেশবান্ধব খামার স্থাপন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং খামার পরিচালনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়নের ক্ষেত্রেও নতুন নীতিমালা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশনা দিয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করা, পোল্ট্রি মাংস ও ডিম প্রক্রিয়াজাত শিল্প স্থাপনে উৎসাহ দেওয়া, পোল্ট্রি উপজাত পুনর্ব্যবহার শিল্প গড়ে তোলা এবং অটোমেশন ও ইন্টারনেট অব থিংস ভিত্তিক স্মার্ট খামার প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এছাড়া নিরাপদ উৎপাদনের জন্য অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প হিসেবে প্রিবায়োটিক ও প্রোবায়োটিক ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের লক্ষ্যে ডিম ও মাংসের মূল্য স্থিতিশীল রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বয়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। সমবায়ভিত্তিক বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলা, কোল্ড স্টোরেজ ও সংরক্ষণ সুবিধা সম্প্রসারণ, মূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদন এবং বহুমুখী বাজার সৃষ্টি করে রপ্তানি বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। বাজার মনিটরিং জোরদার করে ভোক্তা পর্যায়ে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নীতিমালায় পোল্ট্রি বাচ্চা, খাদ্য, ওষুধ ও টিকার মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। প্রাণিস্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় মান নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত আইন ও বিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়নের নির্দেশনা রয়েছে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে দক্ষ জনবল সৃষ্টি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সম্প্রসারণ কার্যক্রম শক্তিশালী করার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পোল্ট্রি খাতের সুশাসন ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে নীতিমালায় একাধিক কমিটি গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালা বাস্তবায়ন সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি, কারিগরি কমিটি, পোল্ট্রি ও পোল্ট্রিজাত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মনিটরিং কমিটি, পোল্ট্রি বাচ্চা ও খাদ্য আমদানি মনিটরিং কমিটি এবং জেলা পর্যায়ের বাণিজ্যিক খামার অনুমোদন কমিটি। এসব কমিটি নীতিমালার বাস্তবায়ন, তদারকি ও মূল্যায়নে দায়িত্ব পালন করবে।
নতুন নীতিমালায় বাণিজ্যিক খামার স্থাপনের জন্য কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের নিবন্ধন ছাড়া কোনো বাণিজ্যিক খামার স্থাপন করা যাবে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি ও জনবসতি এলাকা থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে খামার স্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি জীব-নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়গুলো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নীতিমালায় দেশীয় খামারি ও উদ্যোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রয়োজন ছাড়া আমদানির পরিবর্তে দেশীয় উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তবে, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের ঘাটতি থাকলে বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে পোল্ট্রি বাচ্চা, খাদ্য, টিকা ও ওষুধ আমদানির ক্ষেত্রে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ ও কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জাতীয় পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালা-২০২৬ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হলে দেশের পোল্ট্রি শিল্প আরো সুসংগঠিত, প্রতিযোগিতামূলক ও রপ্তানিমুখী হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, খামারিদের সুরক্ষা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং দেশের প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে এ নীতিমালা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কালের সমাজ//আরআই

