যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের জন্য সুইজারল্যান্ডের জেনেভাকে বেছে নেওয়া হয়েছে। শুক্রবার (১৯ জুন) জেনেভায় দুই দেশের মধ্যে এই সমঝোতা স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে, যা কয়েক সপ্তাহের সংঘাতের পর ৬০ দিনের আলোচনার পথ তৈরি করবে।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।
এই অনুষ্ঠানের আয়োজক হিসেবে থাকবে পাকিস্তান, যারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। জেনেভা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এবং দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শান্তিচুক্তি ও আলোচনার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুইজারল্যান্ডের নিরপেক্ষ অবস্থান, জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার উপস্থিতি এবং কূটনৈতিক আলোচনার জন্য উপযোগী পরিবেশের কারণে জেনেভা এমন গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির জন্য আদর্শ স্থান।
জেনেভায় স্বাক্ষরিত উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ঐতিহাসিক চুক্তি হলো—
জেনেভা কনভেনশন (১৮৬৪ ও ১৯৪৯)
জেনেভার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিলগুলোর একটি হলো জেনেভা কনভেনশন। ১৮৬৪ সালে প্রথম জেনেভা কনভেনশনের মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রে আহত ও অসুস্থ সৈন্যদের সুরক্ষার আন্তর্জাতিক নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৯ সালে ৬৩টি দেশ নতুন করে চারটি জেনেভা কনভেনশনে স্বাক্ষর করে। এসব চুক্তি যুদ্ধের সময় আহত সৈন্য, যুদ্ধবন্দি ও বেসামরিক মানুষের সুরক্ষার আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
জেনেভা চুক্তি (১৯৫৪)
প্রথম ইন্দোচীন যুদ্ধের অবসানে ১৯৫৪ সালে জেনেভায় এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর মাধ্যমে ভিয়েতনাম, লাওস ও কম্বোডিয়ার স্বাধীনতার পথ তৈরি হয় এবং ফরাসি উপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটে। তবে চুক্তির পর ভিয়েতনাম সাময়িকভাবে উত্তর ও দক্ষিণ অংশে বিভক্ত হয়ে যায়।
ইসরায়েল-সিরিয়া বিচ্ছিন্নতা চুক্তি (১৯৭৪)
১৯৭৩ সালের যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ১৯৭৪ সালে ইসরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যে এই চুক্তি হয়। এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং একটি বাফার জোন তৈরি করা হয়, যেখানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন করা হয়।
মিশর-ইসরায়েল চুক্তি (১৯৭৫)
সিনাই-২ চুক্তি নামে পরিচিত এই সমঝোতা মিশর ও ইসরায়েলের মধ্যে ১৯৭৫ সালে জেনেভায় স্বাক্ষরিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের মধ্যস্থতায় হওয়া এই চুক্তি দুই দেশের মধ্যে স্থায়ী শান্তির পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল।
জেনেভা চুক্তি (১৯৮৮)
আফগানিস্তানে সোভিয়েত যুদ্ধের অবসানে ১৯৮৮ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় এই চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এর মাধ্যমে আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহারের পথ তৈরি হয়।
জেনেভা চুক্তি (১৯৯১)
ক্রোয়েশিয়া যুদ্ধের সময় ১৯৯১ সালে ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া ও সাবেক যুগোস্লাভিয়ার মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। এর লক্ষ্য ছিল সংঘাত বন্ধ করা এবং সেনা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু করা।
জেনেভা উদ্যোগ (২০০৩)
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের সমাধানে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের একটি খসড়া পরিকল্পনা হিসেবে ২০০৩ সালে ‘জেনেভা উদ্যোগ’ প্রকাশ করা হয়। যদিও এটি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পক্ষ গ্রহণ করেনি, তবুও শান্তি আলোচনায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হিসেবে বিবেচিত হয়।
কূটনৈতিক ইতিহাসে জেনেভার এই দীর্ঘ ভূমিকার কারণেই নতুন করে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার জন্যও শহরটিকে বেছে নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কালের সমাজ//আরআই

