রাজধানী ঢাকা ও দেশের অন্যান্য শহরে ক্রমবর্ধমান বায়ু ও শব্দ দূষণ জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশের জন্য বড় ধরনের হুমকিতে পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শনিবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত পরিবেশ দূষণবিষয়ক এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে তিনি বায়ু ও শব্দ দূষণ কমাতে দ্রুত বাস্তবসম্মত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
বৈঠকে ইটভাটার কারণে সৃষ্ট বায়ু দূষণকে দেশের অন্যতম প্রধান পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং মানুষের সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে দূষণকারী ইটভাটার বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই সঙ্গে তিনি পরিবেশবান্ধব বিকল্প প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইট উৎপাদনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যাতে উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত রাখার পাশাপাশি পরিবেশের ক্ষতিও কমানো যায়।
বৈঠকে রাজধানীতে যানবাহনের অতিরিক্ত হর্ন বাজানোর বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। অপ্রয়োজনীয় ও উচ্চমাত্রার হর্ন শব্দ দূষণের অন্যতম প্রধান উৎস, যা শিশু, বয়স্ক, শিক্ষার্থী, রোগী এবং কর্মজীবী মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এ কারণে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে আরও কঠোরভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির মতো হর্ন নিয়ন্ত্রণেও এআই প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়েও বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
প্রধানমন্ত্রী আরও নির্দেশ দেন, রাজধানীর সড়ক থেকে দ্রুত ফিটনেসবিহীন, মেয়াদোত্তীর্ণ এবং অতিরিক্ত ধোঁয়া নির্গমনকারী বাস, ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহন অপসারণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের যানবাহন শুধু বায়ু দূষণই বাড়ায় না, বরং সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বহুগুণ বৃদ্ধি করে। তাই পরিবেশ সুরক্ষা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।
যানজট নিরসন এবং সড়ক ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক করতে রাজধানীর অন্তত আরও ৫০টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অটোমেটিক ট্রাফিক লাইট সিস্টেম দ্রুত চালুর নির্দেশও দেন প্রধানমন্ত্রী।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থা চালু হলে যানজট কমবে, অপ্রয়োজনীয় হর্ন বাজানোর প্রবণতাও হ্রাস পাবে এবং সামগ্রিকভাবে নগর পরিবেশ উন্নত হবে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে বায়ু ও শব্দ দূষণ মানুষের শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, মানসিক চাপ, শ্রবণশক্তি হ্রাসসহ নানা জটিল স্বাস্থ্যসমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
একই সঙ্গে পরিবেশ দূষণের কারণে জীববৈচিত্র্য, উদ্ভিদ ও নগরবাস্তুতন্ত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার, ফিটনেসবিহীন যানবাহন অপসারণ এবং অপ্রয়োজনীয় হর্ন বাজানো বন্ধে সরকারি উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের পরিবেশ সংরক্ষণে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. সাইমুম পারভেজ।
এছাড়াও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমেদ, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিসুর রহমানসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিবেশ রক্ষায় সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারি সংস্থার পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদেরও সচেতন ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব আচরণ, অপ্রয়োজনীয় হর্ন ব্যবহার পরিহার এবং যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

