২০২৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের জার্সিতে নজর কাড়ছেন জেড স্পেন্স। তবে তার আলোচনায় থাকার কারণ শুধু পারফরম্যান্স নয়। ২৫ বছর বয়সী এই ডিফেন্ডারই বিশ্বকাপের মঞ্চে ইংল্যান্ডের হয়ে খেলা প্রথম মুসলিম ফুটবলার। নরওয়ের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে জয়ের পর মাঠেই সেজদায় নত হয়ে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর দৃশ্যটি মুসলিম বিশ্বে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ইংল্যান্ডের জার্সিতে খেলার এই অর্জনকে ইংল্যান্ডের মুসলিম সম্প্রদায়ের অনেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছেন। তাদের বিশ্বাস, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মুসলিম তরুণদের বড় স্বপ্ন দেখতে উৎসাহ দেবে।
এক সাক্ষাৎকারে স্পেন্স বলেছিলেন, ‘থ্রি লায়ন্সের হয়ে খেলা প্রথম মুসলিম ফুটবলার হওয়া আমার কাছে সবকিছু। ছোটবেলা থেকেই এটাই ছিল আমার স্বপ্ন।
সবচেয়ে বড় আনন্দ হলো, এখন অনেক শিশু আমাকে দেখে অনুপ্রাণিত হতে পারবে। বিষয়টি শুধু আমার নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরও।’
বিশ্বকাপে স্পেন্সের যাত্রাও ছিল কঠিন। গত মে মাসে চেলসির বিপক্ষে ম্যাচে চোয়াল ভেঙে যাওয়ার পর পুরো টুর্নামেন্টেই কার্বন-ফাইবারের বিশেষ মাস্ক পরে খেলছেন তিনি। শুরুতে বদলি হিসেবে সুযোগ পেলেও ধীরে ধীরে ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগে নিজের জায়গা পাকা করে নিয়েছেন।
সাবেক ফুটবলার রিজ রহমান। তার ভাই জেশ রহমান ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলা প্রথম মুসলিম ফুটবলার ছিলেন। যুক্তরাজ্যের প্রফেশনাল ফুটবলার্স অ্যাসোসিয়েশনে (পিএফএ) ১৫ বছর কাজ করেছেন তিনি। এই সময়ে মুসলিম ফুটবলারদের জন্য নামাজের কক্ষ, রমজান বিষয়ে সচেতনতা এবং ইফতারের জন্য খেলা সাময়িক বন্ধ রাখার মতো নানা উদ্যোগ বাস্তবায়নে ভূমিকা রেখেছেন। সেই কাজের সূত্রেই টটেনহ্যাম হটস্পারে স্পেন্সের সঙ্গে তার পরিচয় হয়।
কয়েক বছর আগে ইসলাম গ্রহণ করা স্পেন্সকে নিয়ে আশাবাদী সাবেক ফুটবলার রিজ রহমান, ‘সে এখন অনেকের রোল মডেল। ভালো চরিত্র ধরে রেখে অন্যদের অনুপ্রাণিত করতে হবে। জেডের ইংল্যান্ড যাত্রা শুধু ফুটবলের গল্প নয়। এটি মুসলিম তরুণদের মনে করিয়ে দেয়, ধর্ম কখনো স্বপ্ন পূরণের পথে বাধা নয়; বরং শক্তি হতে পারে।’
তবে রিজ রহমান একই সঙ্গে সতর্কও করেছেন, ‘একজন খেলোয়াড়ের কাঁধে পুরো একটি সম্প্রদায়ের প্রত্যাশার ভার চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। প্রত্যেক মানুষই নিজের বিশ্বাসের পথে এগিয়ে যায়, জেডও তার ব্যতিক্রম নয়।’
স্পেন্সের ফুটবল প্রতিভা সম্পর্কে এখনো অনেকেই নতুন করে জানতে পারছেন। দক্ষিণ এশীয়দের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সংগঠন দ্য সিন-এর প্রতিষ্ঠাতা শাবনা জাহির, যারা অ্যালকোহলমুক্ত পরিবেশে ফুটবল ম্যাচ দেখার আয়োজন করেন।
শাবনা বলেন, ‘এর আগে আমি স্পেন্সকে খুব একটা অনুসরণ করিনি। ছবিতে তাকে হাত তুলে দোয়া করতে দেখে বুঝতে পারলাম, সে ইসলাম গ্রহণ করেছে। ইংল্যান্ডের কোনো ফুটবলারের কাছ থেকে আমরা আগে এমন দৃশ্য দেখিনি।’
তবে শাবনার কাছে কিছু শঙ্কার জায়গাও আছে, ‘আমি শুধু আশা করি, সবকিছু ভালোভাবেই হবে। কারণ আমাদের অনেকেরই ভয় থাকে, এমন কিছু দেখার পর গণমাধ্যম তার সঙ্গে কী আচরণ করবে।’
শাবনার এই শঙ্কার কারণও আছে। সম্প্রতি তাদের আয়োজিত ম্যাচ দেখার অনুষ্ঠান নিয়ে ফেসবুকে একটি প্রতিবেদন ভাইরাল হওয়ার পর মন্তব্যের বেশির ভাগই ছিল মুসলিমদের ‘মূলধারায় মিশে যেতে’ বা ‘সামাজিক হতে চাইলে পাবে যেতে’ হবে।
তবে দ্য সিন-এর ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর ড্যানিয়েল বেনেট এই আশঙ্কার মধ্যেও ইতিবাচক দিক দেখছেন, ‘এমন এক সময়ে, যখন মুসলিম ও সংখ্যালঘুদের প্রায়ই বিভাজন বা বিতর্কের দৃষ্টিতে দেখা হয়, তখন প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।’
গোলকিপিং কোচ ও স্কাউট মার্ক ওভারঅলের মতে, এখনও তৃণমূল পর্যায়ে কিছু বৈষম্য রয়ে গেছে। তবে স্পেন্সের সাফল্য সেই মানসিকতা বদলাতে সাহায্য করতে পারে, ‘বিশ্বাস বা ধর্ম যাই হোক, যে কেউ সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলতে পারে। ফুটবল সবার খেলা।’
স্পেন্সকে ঘিরে ইতোমধ্যেই মাঠের বাইরেও তৈরি হয়েছে নতুন এক অনুপ্রেরণার গল্প। তার যাত্রাকে সম্মান জানিয়ে যুক্তরাজ্যের গায়ক-গীতিকার বেন সিপোলা লিখেছেন ‘টোটাল ইক্লিপস অব জেড স্পেন্স’ শিরোনামের একটি গান। ফরাসি ক্লাব রেনে ধারে খেলা থেকে শুরু করে ইংল্যান্ডের জার্সিতে বিশ্বকাপের মঞ্চে উঠে আসার পথচলাই উঠে এসেছে সেই গানে। গানের শিরোনামটিও রাখা হয়েছে ১৯৮০-এর দশকের জনপ্রিয় গান ‘টোটাল ইক্লিপস অব দ্য হার্ট’-এর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে। মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি স্পেন্সের গল্প যে মানুষের হৃদয়েও জায়গা করে নিয়েছে, সেটিই যেন তুলে ধরে এই গান।
কালের সমাজ/এসআর

