ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩
বন্যা মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর ১০ নির্দেশনা

বন্যা–দুর্যোগে বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম উদ্ধার ও ত্রাণে প্রশাসনের সর্বাত্মক তৎপরতা

বিশেষ প্রতিনিধি | জুলাই ১০, ২০২৬, ০৫:৫৮ পিএম বন্যা–দুর্যোগে বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম উদ্ধার ও ত্রাণে প্রশাসনের সর্বাত্মক তৎপরতা
ছবি সংগ্রহ

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিওসি)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দেশের পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে। বর্তমানে দেশের নদী পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ১০টি স্টেশন বন্যা পর্যায়ে এবং ৯টি স্টেশন সতর্কতা পর্যায়ে রয়েছে। বিশেষ করে ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

সর্বশেষ পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, বান্দরবানের মাতামুহুরী ও সাঙ্গু নদ, নোয়াখালীর ডাকাতিয়া নদী, হবিগঞ্জের খোয়াই নদ, মৌলভীবাজারের মনু নদ এবং সিলেট ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলের কুশিয়ারা, সুরমা ও মেঘনা নদীর বিভিন্ন স্থানে পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। একই সঙ্গে নেত্রকোনার সোমেশ্বরী নদী এবং তিস্তা নদীর নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধার বিভিন্ন পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে।

দেশজুড়ে টানা ভারি বর্ষণ ও আকস্মিক বন্যায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানসহ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে। লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

অনেক পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে, কৃষিজমি তলিয়ে গেছে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর মানবিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে বন্যা মোকাবিলায় ১০টি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে, যার লক্ষ্য দ্রুত উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

শুক্রবার (১০ জুলাই) প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী জানান, প্রধানমন্ত্রী সার্বক্ষণিক বন্যা পরিস্থিতির খোঁজখবর রাখছেন এবং সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছেন। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হওয়ায় সরকারের সব সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলের মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদেরও দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বন্যাকবলিত এলাকায় ইতোমধ্যে ১ হাজার ৫৭টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে হাজারো মানুষ নিরাপদে অবস্থান করছেন এবং তাদের জন্য তিন বেলা খাবার, বিশুদ্ধ পানীয় জল, চিকিৎসাসেবা, স্যানিটেশন সুবিধা ও শিশুখাদ্যের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিনিয়ত নতুন করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসা হচ্ছে।

সরকারি সহায়তার অংশ হিসেবে জেনারেল রিলিফ (জিআর) কর্মসূচির আওতায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলার জন্য ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা এবং ৩ হাজার ৪৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এসব সহায়তা দ্রুত দুর্গত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, প্রয়োজনীয় ওষুধ, স্যালাইন, শিশু খাদ্য এবং অন্যান্য জরুরি সামগ্রী বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।

বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ এবং স্বেচ্ছাসেবীরা একযোগে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। পাহাড়ি এলাকায় কোথাও কোথাও ভূমিধসের আশঙ্কা থাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী সেনাবাহিনী মোতায়েনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজও অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে টানা বৃষ্টি ও বন্যার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। দুর্গত অঞ্চলের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। পরীক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে নতুন সময়সূচি ঘোষণা করা হবে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় স্থানীয় সংসদ সদস্য, জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনের কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন। যারা স্বজন হারিয়েছেন বা সম্পদহানির শিকার হয়েছেন, তাদের প্রতি সমবেদনা জানানো হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দুর্গত এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করতে মেডিকেল টিম কাজ করছে, যাতে পানিবাহিত রোগ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেলপথের জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি কমাতে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার রেলপথ পাঁচ ফুট উঁচু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। পাশাপাশি পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর জন্য নিরাপদ স্থানে আবাসনের ব্যবস্থাও গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে অপ্রয়োজনে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় না যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলা, আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করা এবং গুজবে কান না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের বিত্তবান ব্যক্তি, সামাজিক সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবীদের দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহাদী আমিন বলেন, সরকারের দ্রুত সিদ্ধান্ত, মানবিক উদ্যোগ এবং প্রশাসনের সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমে এই দুর্যোগ সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদী। তিনি জানান, সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এখন বন্যাদুর্গত মানুষের জীবন রক্ষা, খাদ্য ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনতে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করা।

‘চট্টগ্রাম অঞ্চলে দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর গৃহীত ১০টি উদ্যোগ’ শিরোনামে মাহদী আমিন ফেসবুকে পোস্ট করেন। সেখানে তিনি প্রধানমন্ত্রীর গৃহীত ১০টি উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। উদ্যোগগুলো হুবহু তুলে ধরা হলো—

১. প্রধানমন্ত্রী নিজে সার্বক্ষণিক দুর্যোগকবলিত এলাকার খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং মনিটরিং করাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও নিয়মিতভাবে ডিসি, ইউএনও এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।

২. চট্টগ্রাম বিভাগের দুর্যোগকবলিত এলাকায় এখন পর্যন্ত ১,০৫৭টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে, যেখানে এখন পর্যন্ত প্রায় ১২ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় গ্রহণ করেছেন।

৩. জেনারেল রিলিফ (জিআর) কর্মসূচির আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান— এই ৫টি জেলার জন্য ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা অনুদান এবং ৩,৪৫০ মেট্রিক টন চাল দুর্গত মানুষের কাছে দ্রুততম সময়ে সরাসরি পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

৪. সরকারের নির্দেশনায় দুর্গত এলাকায় নিরাপদ খাবার পানি, স্যানিটেশন ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, শিশুখাদ্য এবং তিন বেলা খাবার সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।

৫. জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনায় পাহাড়ি এলাকায় উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি প্রয়োজনবোধে সেনাবাহিনীও মোতায়েন করা হয়েছে।

৬. চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় প্রবল বর্ষণে প্লাবিত অঞ্চল পরিদর্শন, ত্রাণ বিতরণ এবং প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সহায়তার বার্তা পৌঁছে দিতে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জনপ্রতিনিধিরা দুর্গত এলাকায় ছুটে গিয়ে সার্বক্ষণিক অবস্থান করছেন, সশরীরে মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন।

৭. দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে রাষ্ট্র পরিচালনাকারী দল বিএনপির সর্বস্তরের নেতা-কর্মী ও প্রতিটি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সবাই ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক উদ্যোগে ইতোমধ্যেই মাঠে নেমেছেন। একই সঙ্গে, প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশনায় সরকারের প্রশাসন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সেনাবাহিনী এবং কোস্টগার্ড মাঠপর্যায় থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত একযোগে কাজ করছে। এই সংকটে রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গ জনগণের পাশে রয়েছে।

৮. ভারী বর্ষণের ফলে সৃষ্ট বন্যা ও ভূমিধস পরিস্থিতির কারণে দুর্গত এলাকায় এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।

৯. এই দুর্যোগে হতাহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সমবেদনা জানাতে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের বাড়ি পরিদর্শন করেছেন।

১০. টানা ভারি বর্ষণে পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেলপথ ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি কমাতে পাঁচ ফুট উঁচু করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত ৪৭ কিলোমিটার রেলপথের উচ্চতা বৃদ্ধির কাজের দরপত্র প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এছাড়াও পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা বাসিন্দাদের জন্য সরকার নিরাপদ স্থানে আবাসনের ব্যবস্থা করবে।

ফেসবুক পোস্টের শেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র বলেন, আমরা বিশ্বাস করি সরকারের দ্রুত সিদ্ধান্ত, মানবিক প্রয়াস ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা এই দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হব, ইনশাআল্লাহ। প্রধানমন্ত্রী এই সংকটে গভীর ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে আছেন। জনগণের সরকার সবসময় আর্তমানবতার সেবায় নিয়োজিত রয়েছে।
কালের সমাজ/এএইচবি 

জাতীয় বিভাগের আরো খবর

Link copied!