ভারী বর্ষণ, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়েছে। জেলার বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। কক্সবাজারের অন্তত ১০০টি গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে এবং প্রায় দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। টানা বৃষ্টিতে পাহাড় ধসের ঝুঁকিও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে কক্সবাজারে পাহাড় ধসে রোহিঙ্গা নারী ও শিশুসহ ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া বন্যার পানিতে ডুবে তিন শিশুরও প্রাণহানি ঘটেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্র শুক্রবার (১০ জুলাই) জানিয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের নিচু এলাকায় অস্থায়ী জলাবদ্ধতার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকায় অতিবৃষ্টির কারণে ভূমিধসের উচ্চ ঝুঁকির কথা জানিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্র জানায়, টানা কয়েক দিনের বর্ষণ এবং পাহাড়ি ঢলে চকরিয়া, পেকুয়া, রামু, মাতামুহুরীসহ বিভিন্ন উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পেকুয়া উপজেলার মেহেরনামা এলাকা। সেখানে মাতামুহুরী নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে নদীর পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে। ফলে কয়েকটি গ্রাম সম্পূর্ণ জলমগ্ন হয়ে গেছে। বর্তমানে মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
একইভাবে চকরিয়ার কাকারা, কৈয়ারবিল, লক্ষারচর ও ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন, মাতামুহুরী উপজেলার পূর্ব বড় ভেওলা ও বিএমচর ইউনিয়ন এবং পেকুয়া উপজেলার সদর, পৌরসভা, মেহেরনামা ও শীলখালী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। রামু উপজেলার গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া ও রাজারকুল ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামেও জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। বাকখালী নদীর পানিও বিপৎসীমার কাছাকাছি বা তার ওপরে প্রবাহিত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
বন্যাকবলিত এলাকার বাসিন্দারা জানান, ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় বাজারও পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

অন্যদিকে, টানা বর্ষণে পাহাড় ধসের আশঙ্কা বাড়ায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং করে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন পাহাড়ি এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত সতর্কতা গ্রহণ করা হয়েছে।
এদিকে বঙ্গোপসাগর উত্তাল থাকায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সমুদ্রে মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পরিস্থিতির অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করেছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। দুর্গত এলাকায় শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসাসেবা ও জরুরি ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে ১০ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে, দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা, পর্যাপ্ত ত্রাণ বিতরণ, আশ্রয়কেন্দ্রে নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া, নদীবাঁধ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখা, বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা দ্রুত পুনর্বহাল, সার্বক্ষণিক আবহাওয়ার পূর্বাভাস প্রচার এবং দুর্গত মানুষের পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। উজান থেকে আরও ঢল নামার আশঙ্কা থাকায় নদ-নদীর পানি আরও বাড়তে পারে। ফলে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতির শঙ্কা রয়েছে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের অপ্রয়োজনীয় বাইরে যাওয়া থেকে বিরত থাকা এবং প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
কালের সমাজ/এ এএইচবি

