ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩

সেমিফাইনালে হারে না আর্জেন্টিনা, ভাঙতে পারবে কি ইংল্যান্ড?

স্পোর্টস ডেস্ক | জুলাই ১৫, ২০২৬, ০৯:১৫ পিএম সেমিফাইনালে হারে না আর্জেন্টিনা, ভাঙতে পারবে কি ইংল্যান্ড?

২০২৬ বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে আজ মুখোমুখি হচ্ছে ফুটবল বিশ্বের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই ম্যাচে জয়ী দল জায়গা করে নেবে ফাইনালে।

ইতিহাস, পরিসংখ্যান ও বর্তমান ফর্ম—সব মিলিয়ে দুই দলের লড়াইকে ঘিরে বাড়তি উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। তবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে এখন পর্যন্ত কখনো না হারার রেকর্ড নিয়ে মাঠে নামছে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে, সেই অদম্য রেকর্ড ভেঙে ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন দেখছে ইংল্যান্ড।

অপটা সুপারকম্পিউটারের হিসাব বলছে, দুই দলের শক্তির পার্থক্য খুবই কম। অতিরিক্ত সময় ও টাইব্রেকারসহ ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনায় ইংল্যান্ড কিছুটা এগিয়ে। তাদের সম্ভাবনা ৫২.৩ শতাংশ, আর আর্জেন্টিনার ৪৭.৭ শতাংশ।

বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের লড়াই সব সময়ই আলাদা গুরুত্ব বহন করে। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ককে তিক্ত করে তুলেছিল। সেই উত্তেজনা পরে ফুটবল মাঠেও ছড়িয়ে পড়ে।

১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল এবং এরপর করা ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ ফুটবল ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। সেই ম্যাচে ২-১ ব্যবধানে জিতেছিল আর্জেন্টিনা।

এরপর ১৯৯৮ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে আবারও মুখোমুখি হয়েছিল দুই দল। টাইব্রেকারে জয় পায় আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচে ডিয়েগো সিমিওনের ওপর ফাউল করে লাল কার্ড দেখেছিলেন ডেভিড বেকহ্যাম। পরে ইংল্যান্ডে দীর্ঘ সময় সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল তাকে।

তবে ২০০২ বিশ্বকাপে সেই হতাশার প্রতিশোধ নেয় ইংল্যান্ড। গ্রুপ পর্বের ম্যাচে বেকহ্যামের পেনাল্টি গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় পায় থ্রি লায়ন্সরা। এরপর ২০০৫ সালের একটি প্রীতি ম্যাচেও ৩-২ ব্যবধানে জিতেছিল ইংল্যান্ড।

এবারের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড কঠিন পথ পেরিয়ে সেমিফাইনালে এসেছে। কোয়ার্টার ফাইনালে তারা অতিরিক্ত সময়ে নরওয়েকে ২-১ ব্যবধানে হারায়। সেই ম্যাচে জোড়া গোল করেন জুড বেলিংহাম।

রিয়াল মাদ্রিদের এই মিডফিল্ডার টানা দুই বিশ্বকাপ ম্যাচে জোড়া গোল করেছেন। বিশ্বকাপ ইতিহাসে মিডফিল্ডার হিসেবে একাধিক ম্যাচে জোড়া গোল করার কীর্তি তার আগে কেবল পেরুর তিওফিলো কুবিলাস গড়েছিলেন।

অধিনায়ক হ্যারি কেইনও দুর্দান্ত ছন্দে আছেন। কেইন ও বেলিংহাম দুজনই এবারের বিশ্বকাপে ছয়টি করে গোল করেছেন। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এই প্রথম কোনো দেশের দুই খেলোয়াড় একই আসরে ছয় বা তার বেশি গোল করলেন।

হ্যারি কেইন এই ম্যাচে খেললে সেটি হবে ইংল্যান্ডের জার্সিতে তার ১২১তম ম্যাচ। এর মাধ্যমে গোলরক্ষক বাদ দিলে দেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা ফুটবলারদের তালিকায় শীর্ষে উঠে আসবেন তিনি। কেবল গোলরক্ষক পিটার শিলটন তার চেয়ে বেশি, ১২৫টি ম্যাচ খেলেছেন।

২০১৮ সালের পর থেকে বড় টুর্নামেন্টে এটি ইংল্যান্ডের চতুর্থ সেমিফাইনাল। এর আগে পুরো ইতিহাসে তারা মাত্র চারবার শেষ চারে উঠতে পেরেছিল।

থমাস টুখেলের লক্ষ্য ইংল্যান্ডের ৬০ বছরের শিরোপা-খরা ঘোচানো। একই সঙ্গে তিনি চতুর্থ কোচ হিসেবে নিজের দেশের বাইরে অন্য একটি জাতীয় দলকে বিশ্বকাপের ফাইনালে তোলার কীর্তি গড়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

অন্যদিকে আর্জেন্টিনা ইতিহাসের অন্যতম সফল বিশ্বকাপ দল। ব্রাজিল পাঁচবার, জার্মানি ও ইতালি চারবার করে শিরোপা জিতলেও আর্জেন্টিনার ঝুলিতে রয়েছে তিনটি বিশ্বকাপ।

চার বছর আগে কাতারে ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল আলবিসেলেস্তেরা। এবার তারা টানা দ্বিতীয় শিরোপার খুব কাছাকাছি।

বিশ্বকাপে এটি হবে আর্জেন্টিনার ষষ্ঠ সেমিফাইনাল। এর আগে পাঁচবার সেমিফাইনাল খেলেই প্রতিবার জয় পেয়েছে তারা। বিশ্বকাপ ইতিহাসে সেমিফাইনালে শতভাগ জয়ের এমন রেকর্ড আর কোনো দলের নেই।

এবারের বিশ্বকাপেও দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছে স্কালোনির দল। টানা ছয়টি জয় ইতোমধ্যে বিশ্বকাপে তাদের ইতিহাসের দীর্ঘতম জয়যাত্রা। শেষ চারটি ম্যাচের প্রতিটিতে তারা তিনটি করে গোল করেছে।

চলতি আসরে আর্জেন্টিনা এখন পর্যন্ত ১৭টি গোল করেছে, যা সব দলের মধ্যে সর্বোচ্চ। নিজেদের এক আসরে সর্বাধিক ১৮ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করতে তাদের আর মাত্র একটি গোল প্রয়োজন।

এই ১৭ গোলের মধ্যে আটটি করেছেন লিওনেল মেসি। ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপের সঙ্গে যৌথভাবে তিনিই এখন টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা।

কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে গোল না পেলেও একটি অ্যাসিস্ট করেছিলেন মেসি। এর মাধ্যমে তিনি ২০২২ ও ২০২৬—দুই বিশ্বকাপেই ১০ বা তার বেশি গোলে সরাসরি অবদান রাখার রেকর্ড গড়েছেন। ১৯৬৬ সালের পর এই কীর্তি গড়া মাত্র দ্বিতীয় ফুটবলার তিনি।

লিওনেল স্কালোনিও ইতিহাস গড়ার সামনে দাঁড়িয়ে। তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সপ্তম কোচ হিসেবে দুটি ফাইনালে দল তোলার কীর্তি গড়তে পারেন। আর্জেন্টিনার ইতিহাসে কার্লোস বিলার্দোর পর দ্বিতীয় কোচ হিসেবে এই রেকর্ডের সুযোগ রয়েছে তার সামনে।

পরিসংখ্যান বলছে, দুই দলের ১৪টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ইংল্যান্ড জিতেছে ছয়টিতে, আর্জেন্টিনা দুটি ম্যাচে এবং বাকি ছয়টি ড্র হয়েছে। তবে বিশ্বকাপে দুই দলের লড়াই সব সময়ই আলাদা মাত্রা পেয়েছে।

অপটা সুপারকম্পিউটারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, নির্ধারিত ৯০ মিনিটে ইংল্যান্ডের জয়ের সম্ভাবনা ৩৭.৩ শতাংশ, আর্জেন্টিনার ৩২ শতাংশ এবং ড্র হওয়ার সম্ভাবনা ৩০.৭ শতাংশ।

তবে অতিরিক্ত সময় ও টাইব্রেকার হিসাব করলে ব্যবধান আরও কমে আসে। সেখানেও ইংল্যান্ডের সম্ভাবনা ৫২.৩ শতাংশ, আর আর্জেন্টিনার ৪৭.৭ শতাংশ।

সব মিলিয়ে ইতিহাস, বর্তমান ফর্ম এবং পরিসংখ্যান—সবকিছুই বলছে, আটলান্টার এই সেমিফাইনাল হতে যাচ্ছে এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত ও জমজমাট লড়াইগুলোর একটি।

কালের সমাজ/এসআর

Link copied!