ঢাকা বুধবার, ০১ এপ্রিল, ২০২৬, ১৭ চৈত্র ১৪৩২
রামুর গর্জনিয়া সীমান্তে বেপরোয়া চোরাকারবারিরা বলরাম দাশ অনুপম

গরু থেকেই পুলিশ ফাঁড়ির আইসি’র বাণিজ্য

জেলা প্রতিনিধি, কক্সবাজার | মার্চ ৩১, ২০২৬, ০৮:৫৮ পিএম গরু থেকেই পুলিশ ফাঁড়ির আইসি’র বাণিজ্য

এসব প্রতিরোধে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি অনেকটা তৎপর থেকে দায়িত্ব পালন করলেও পুলিশের কার্যক্রম নেই বললেই চলে। তবে অভিযোগ রয়েছে যারা গরু এবং সিগারেট পাচারের সাথে সম্পৃক্ত সিন্ডিকেট রয়েছে তাদের সাথে দৈনিক মোটা অংকের বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন ফাঁড়ির ইনচর্জি শোভন কুমার সাহা।

স্থানীয়দের মতে, পুলিশের ‘অঘোষিত ক্যাশিয়ার ছিল সোহেল (২৮)। যে সকল চোরাকারবারিদের কাছে পুলিশের ক্যাশিয়ার নামে পরিচিত। তবে সম্প্রতি সময়ে একটি ঘটনায় কিছুটা গা-ঢাকা দিয়ে পুলিশের চাঁদা আদায় করলেও বর্তমানে জনসম্মুখে এসেছে আরো দুই ক্যাশিয়ার। তারা হলেন দেলোয়ার ও করিম। মূলত সোহেল। আড়ালে থেকে বীরদর্পে পুলিশের হয়ে গরু ও সিগারেট চোরাচালানকারিদের কাছ থেকে দৈনিক চাঁদার টাকা আদায় করে যাচ্ছেন দেলোয়ার ও করিম। পরে এসব টাকা গর্জনিয়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ শোভন কুমার সাহা কড়া গন্ডায় বুঝে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ ওঠেছে।

তবে পুলিশের ক্যাশিয়ার হিসেবে পরিচিত সোহেল দাবী করেন, প্রতিনিয়ত সীমান্ত দিয়ে গরু ঢুকতেছে সত্য। কিন্তু বর্তমান আইসির সময়ে আমি কিছুদিন টাকা তোলে দিয়েছি। বর্তমানে আমি পুলিশ ফাঁড়িতে যায়না। বাইরে থেকে মাঝে মধ্যে ডাকলে সহযোগিতা করি। বর্তমানে কাজ করছেন ৩নং ওয়ার্ডের নতুন তিতার পাড়ার দেলোয়ার ও করিম। তারা বর্তমানে পুলিশের টাকা আদায় করে থাকেন।

এদিকে স্থানীয় লোকজনের দাবী, পাহাড়ি সীমান্ত পথ গর্জনিয়ায় পুলিশ ফাঁড়ি করা হয়েছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাসহ চোরাকারবারিদের প্রতিরোধ করার জন্য। কিন্তু বর্তমান পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ প্রতিরোধের পরিবর্তে চোরাকারবারিদের সাথে আতাঁত করে সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমার থেকে এদেশে ঢুকানো প্রতি গরু থেকে এক হাজার ৫ শ’ টাকা করে আদায় করছে। আর এই টাকা আদায়ের জন্য কাজ করছে দেলোয়ার ও করিম। স্থানীয়দের দাবী, আইসি’র সাথে চোরাকারবারিদের আতাঁতের বিষয়ে নাম প্রকাশ না করে রামু থানার অফিসার ইনচার্জকে একাধিকবার জানানো হলেও কোন প্রকার প্রতিকার পাওয়া যায়নি। পরে জানতে পারি এই পুলিশ ফাঁড়ি রামু থানার মধ্যে হলেও সরাসরি পুলিশ সুপার তদারকি করে থাকেন। তবে একজন সৎ এবং নীতিবান পুলিশ সুপারের নিয়ন্ত্রনে কিভাবে শোভনের মতো দুর্নীতিবাজ অফিসার চাকরি করে এটাই বর্তমানে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।  

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানায়,  গর্জনিয়া সীমান্ত দিয়ে এদেশ থেকে পাচার হচ্ছে ভোজ্যতেল, চাল-ডাল, পেঁয়াজ-রসুন, সিমেন্ট ও বিভিন্ন নিত্যপণ্য। ওপার থেকে আসছে ইয়াবা, আইসসহ মিয়ানমারের গরু ও সিগারেট। এদেশ থেকে অবৈধভাবে যাওয়া বিভিন্ন পণ্যের বস্তা প্রতি পুলিশের নামে টাকা ওঠে ৫০০ টাকা। আর মিয়ানমার থেকে আসা প্রত্যেক গরু থেকে এক হাজার ৫শ টাকা নিচ্ছে পুলিশ। বিশেষ করে গরুর বহরে লুকিয়ে আনা হয় ইয়াবা ও আইসের চালান।

সূত্র আরো জানায়, বর্তমানে ডাকাত রহিম উল্লাহর নেতৃত্বে একাধিক চোরাচালান কারবারি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। এই রহিম উল্লাহ চোরাচালানের শীর্ষ স্থান দখল করে রাখলেও আরো অনেকেই দলীয় পরিচয়হবন করে দেদারছে চোরাকারবারের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। এছাড়া মানবপাচার, চোরাকারবার, হুন্ডি ও ইয়াবার রমরমা ব্যবসা করে ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে তৌহিদু ইসলাম। বর্তমানে তার নিয়ন্ত্রনে রয়েছে বিশাল সিন্ডিকেট। এছাড়াও নিজেদের মতো পুলিশ ম্যানেজ করে গরু ও সিগারেট পাচারে রমরমা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে রামুর জাবেদ ইকবাল, কচ্ছপিয়া হাজী পাড়ার নজরুল, শওকত, আবু ঈসা, জসিম, মতলব, ধলা পুতু, সোহেল সিকদার, শাকিল সিকদার, আশেক, সুজন, সেলিম, কালা সোহেল, মেহের আলী, কামাল, মোস্তফা, এজেন্ট ব্যাংকের আলমসহ আরো অনেকেই।

পুলিশ, স্থানীয় লোকজন ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গর্জনিয়া ও কচ্ছপিয়ার পাহাড়ি সীমান্ত পথ দিয়ে মিয়ানমার থেকে কয়েকদিন পর পর বা অনেক সময় প্রতিদিন শত শত গরু ঢুকছে দেশে। তার বেশিরভাগ গরু গর্জনিয়া বাজারে তোলা হয়। তবে কিছু গরু পাহাড়ি পথ বেয়ে অন্যান্য বাজারে নেওয়া হয়। চোরাই পথে আসা এসব গরু স্থানীয় হিসেবে চালাতে চোরাকারবারিরা ইউনিয়ন পরিষদের কাগজপত্রও ব্যবহার করছে। তাদের মতে, উল্লেখিত চোরাকারবারিরা কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মোহাম্মদ বেলালের ছেলে মো. ফোরহান ওরফে সোহেলকে দিয়ে দীর্ঘদিন প্রতি গরু থেকে এক হাজার ৫শ’ টাকা ও সিগারেটের প্রতি কাটুন থেকে এক হাজার টাকা আদায় করলেও বর্তমানে সোহেলের পরিবর্তে চাঁদা আদায় করছে করিম ও দেলোয়ার।

এদিকে উল্লেখিত অভিযোগ অস্বীকার করে গর্জনিয়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ শোভন কুমার সাহা বলেন, ‘আমি সোহেল, করিম ও দেলোয়ারকে চিনি না। আমার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ সত্য নয়।’ এছাড়া ইন্সপেক্টর শোভন সাহা কক্সবাজার শহর ফাঁড়িতে কর্মকালীন অবস্থায় চোলাই মদ ব্যবসায়ি ও রাখাইন পাড়ার মদ ব্যবসায়িদের কাছ থেকে টাকা আদায়েরও গুরুতর অভিযোগ ছিল। এই প্রসঙ্গে শোভন সাহা বলেন, এসবও মিথ্যা। আমি কখনো মাদক ব্যবসায়িদের কাছ থেকে মাসোহারা কিংবা চাঁদা নিই নাই।
উপরোক্ত বিষয়ে জানতে চাইলে রামু থানার অফিসার ইনচার্জ মরিুল ইসলাম ভূইয়া বলেন, গর্জনিয়া পুলিশ ফাঁড়ির বিষয়ে আমার উর্ধ্বতন অফিসারদের সাথে কথা বললে ভালো হয় বলে তিনি ফোন লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেন।

কক্সবাজার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মাহামদুল হাসান বলেন, আমি নতুন যোগদান করেছি। এখনো থানা কিংবা পুলিশ ফাঁড়ি বিশেষভাবে ভিজিট করা হয়নি। তবে দ্রুত সময়ে সদর ও রামু থানাসহ তার আওতাধীন সকল পুলিশ ফাঁড়ি ভিজিট করা হবে। পাশাপাশি খোঁজখবর নিয়ে যদি দায়িত্বরত কোন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোন প্রকার অনিয়ম ও দুর্ণীতির প্রমাণ মিলে তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

 

  কালের সমাজ/ কে.পি

Link copied!