ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দাউদকান্দির হাসানপুর এলাকায় ট্রাকটি উল্টে যায়। এতে চাউলের বস্তা ও ট্রাক চাপায় ঘটনাস্থলেই মারা যান ৭ জন।
কুমিল্লার হাইওয়ে ক্রসিং থানার লাশ ঘরে সারি করে রাখা সাতটি মরদেহ। তার মধ্যে একটি লাশের পাশে বেগুনি রঙের টি-শার্ট হাতে আহাজারি করছিলেন সামিউল ইসলাম।
কান্না জড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “এই জামা আমি কিনে দিয়েছি। সুমন আর এই জামা পরবে না। প্রতিবছর জীবিকার তাগিদে সুমন আমার কাছে কুমিল্লায় আসে, এবার এসে জীবনটাই হারালো।”
সামিউলের ভাই সুমনের মতো জীবিকার খোঁজে উত্তরবঙ্গ থেকে সোমবার রাতে কুমিল্লার উদ্দেশ্যে আসছিলেন ১৩ জন। খরচ বাঁচাতে তারা চেপেছিলেন চালের ট্রাকে।
কিন্তু মঙ্গলবার ভোরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দাউদকান্দির হাসানপুর এলাকায় ট্রাকটি উল্টে যায়। এতে চাউলের বস্তা ও ট্রাক চাপায় ঘটনাস্থলেই মারা যান ৭ জন। আহত হন আরও ৬ জন।
সুমন-সামিউলের বাড়ি দিনাজপুর জেলার বিরামপুরের ভাইগড় গ্রামে। সেখান থেকে কুমিল্লা-ফেনী অঞ্চলে কাজের খোঁজে আগেই এসেছিলেন সামিউল। কাজ পেয়েছেন ফেনীতে।
দুর্ঘটনায় ভাইয়ের মৃত্যুর খবরে থানায় আসেন তিনি। পরে ভাইয়ের লাশের পাশে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তিনি। লাশের পাশে থাকা সুমনের জামা-কাপড়-মশারির ব্যাগ থেকে বের করে নেন টি-শার্ট।
কাঁদতে কাঁদতে তিনি উত্তর খুঁজছেন ভাইগড় গ্রামের বাড়িতে থাকা বাবা-মাকে সামিউলের কি হয়েছে, কি বলবেন সেই প্রশ্নের।
একই জেলার খালেদপুর এলাকার সোহরাব হোসেনকে বাড়ি ছেড়ে আসতে নিষেধ করেছিলেন স্ত্রী চম্পা আক্তার। কিন্তু দুই মেয়ের ভরণপোষণের কথা ভেবে এবারই প্রথমবার শ্রমিকের কাজ করতে কুমিল্লা রওয়ানা হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তার বদলে হারালেন প্রাণটাই।
খবর পেয়ে ফেনী থেকে তার লাশ নিতে আসা ভগ্নিপতি জসিম উদ্দিন জানালেন এসব কথা।
তিনি আরও বলেন, এবার ওই এলাকায় কাজকর্ম তেমন নেই। তাই এই মৌসুমে ধানকাটার শ্রমিকের কাজের আশায় আসছিলেন সোহরাব। তার স্ত্রী তাকে আসতে নিষেধ করলেও সে শুনেনি।
কাজের সন্ধানে বের হওয়া সুমন-সোহরাবদের ট্রাকে ওঠা নিয়ে নিরাপদ সড়ক চাই- দাউকান্দি উপজেলা সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন বলেন, “দিনাজপুর থেকে কুমিল্লা আসতে বাসে জনপ্রতি কম করে হলেও দেড় হাজার টাকা খরচ হয়। খরচ বাঁচাতে এই শ্রমিকরা চালের ট্রাকের ওপরে উঠেন। এতে হয়তো তাদের দুই/তিনশ টাকা জনপ্রতি খরচ হয়।
“টাকার অভাবেই তো তারা অন্য জেলায় আসছেন কাজের খোঁজে, অভাবের কারণে বাধ্য হয়েই তারা এভাবে বেআইনীভাবে পণ্যবাহী ট্রাকে আসছিলেন।”
“তবে পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী পরিবহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যদি তাদের কেউ বাধা দিত, তাহলে এতগুলো প্রাণহানি এড়ানো যেত।”
আলমগীর হোসেন আরও বলেন, “আমি আহতদের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা জানিয়েছে মুন্সিগঞ্জের মেঘনা টোলপ্লাজায় এসে চালকের আসনে বসেন হেল্পার। সেখান থেকে আনুমানিক ১৫ কিলোমিটার দূরে এসেই সে ট্রাকের নিয়ন্ত্রণ হারায়, আর এই প্রাণহানি ঘটে।”
দিনাজপুর থেকে চট্টগ্রামগামী চালবোঝাই ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের নিচে পড়ে গেলে ট্রাকের ওপর থাকা ১৩ জন নিচে চাপা পড়েন। এতে ঘটনাস্থলেই সাতজনের প্রাণ যায়।
তারা হলেন, দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার খালিবপুর গ্রামের আজাদের ছেলে মোহাম্মদ আফজাল হোসেন (৩৫), আলম মিয়ার ছেলে সোহরাব হোসেন (৪০), ফজলুর রহমানের ছেলে সালেক (৪৫), একই জেলার বিরামপুর উপজেলার ভাইঘর গ্রামের পলাশ মিয়ার ছেলে সুমন (২১), মজিরুল ইসলামের ছেলে আবু হোসেন (৩০), একই গ্রামের বাসিন্দা বিষু মিয়া (৩৫) এবং রকিবুল্লার ছেলে আব্দুর রশিদ (৫৫)।
দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে আসেন হাইওয়ে কুমিল্লা রিজিয়ন পুলিশ সুপার শাহিনুর আলম খান, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য খন্দকার মারুফ হোসেন, দাউদকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাসরিন আক্তার।
তাৎক্ষণিক ভাবে জেলা প্রশাসন থেকে নিহতদের পরিবহনের জন্য ২৫ হাজার টাকা ও আহতদের চিকিৎসার জন্য ১৫ হাজার টাকা সহযোগিতা দেয়া হয়।
এসময় পুলিশ সুপার শাহিনুর আলম খান বলেন, “দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্তের পর জানা যাবে। তবে প্রাথমিকভাবে দেখা গেছে, যে জায়গায় দুর্ঘটনা সেখানে মহাসড়কের অবস্থা ভালো।
“তাহলে বোঝা যায় যানবাহনটি যেহেতু দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে দিনাজপুর থেকে আসছিলো- সেক্ষেত্রে চালক কতক্ষণ গাড়ি চালাচ্ছিল কিংবা তার লাইসেন্স আছে কি, নাই - এই বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
কালের সমাজ/কে.পি

