দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়াকে এক ‘নতুন স্বর্ণযুগের বিজয়’ হিসেবে উদযাপন করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বলছে ভিন্ন কথা। রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর শুক্রবার থেকে পাকিস্তানে শুরু হতে যাওয়া শান্তি আলোচনায় ইরান অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে থেকে প্রবেশ করছে।
সংঘাতের এই চূড়ান্ত পর্যায়ে ট্রাম্প তাৎক্ষণিক কিছু সাফল্য পেলেও দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক লড়াইয়ে তেহরান টিকে আছে স্বমহিমায়। এমন পরিস্থিতির কথা এক বিশ্লেষণে তুলে ধরেছেন ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের সিনিয়র ইন্টারন্যাশনাল করেসপন্ডেন্ট জুলিয়ান বোর্জার।
বোর্জার লিখেছেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে তেহরান সরকার রক্তাক্ত হলেও এখনও অক্ষত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সংঘাতের মূল কারণ যে উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম, তার বিশাল মজুদ এখনও ইরানের হাতেই রয়ে গেছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির ওপর আংশিক নিয়ন্ত্রণ দাবি করে ইরান বিশ্বকে জিম্মি করার সক্ষমতাও প্রদর্শন করেছে।
অন্যদিকে ট্রাম্প এই নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্রে থাকতে পেরে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি পাচ্ছেন। কয়েক ঘণ্টা আগে যেখানে তিনি ‘একটি পুরো সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়ার’ হুমকি দিয়ে বিশ্বকে আতঙ্কিত করেছিলেন, সেখানে হঠাৎ পথ পরিবর্তন করে তিনি এখন বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথে তারা ‘অনেক দূর’ এগিয়েছেন। ট্রাম্পের কথায় তেলের দাম কমেছে এবং বিশ্ব শেয়ার বাজারে চাঞ্চল্য ফিরেছে, যা প্রমাণ করে যে স্বল্পমেয়াদী বাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা এখনও তার হাতে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রায় ৪০ দিন ধরে যুদ্ধ চলার পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বিরতিতে সম্মত হয়েছে দুই পক্ষ। কিন্তু ইরান এখানে মাথা নত করেনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে দুর্বল ভেবেছিলেন। সেই হিসাব এখন উল্টে গেছে। শেষমেশ নিজেই ইরানের ১০ দফায় সম্মত হয়ে পিছু হটেছেন।
ট্রাম্প একসময় ইরানিদের বলেছিলেন, তাদের সরকার ‘তাদের নিজেদের দখলে নেওয়ার জন্য’। এখন সেই একই মানুষকে হুমকি দিচ্ছেন ইরানকে ‘পাথর যুগে ফিরিয়ে দেওয়ার’। এই পরিবর্তন অনেক কিছু বলে দেয়।

হরমুজ প্রণালিতে ট্রাম্প হাজার হাজার মেরিন সেনা পাঠিয়েছিলেন। লক্ষ্য ছিল প্রণালি জোর করে খুলে দেওয়া। কিন্তু এখন মার্কিন নৌবহর নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে। ইরান নিজেই ঠিক করছে কোন জাহাজ যাবে আর কোনটা যাবে না। প্রতিটি জাহাজকে এখন ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত চাইনিজ ইউয়ানে টোল দিতে হচ্ছে।
ইসরায়েলি সেনাপ্রধান এয়াল জামির এক মাস আগে দাবি করেছিলেন, ইরানের ৮০ শতাংশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু এখন নিয়মিত মার্কিন যুদ্ধবিমান ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ১৩ হাজারেরও বেশি বিমান হামলার পরও ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে বলে মনে হচ্ছে।
ইরাক, সিরিয়া বা লিবিয়ার মতো ইরান ভেঙে পড়েনি। সেই দেশগুলোতে নেতা পালালেই বা মারা গেলেই সরকার ধসে পড়েছিল। কিন্তু ইরানের ব্যবস্থা আলাদা। মোসাদ ও সিআইএর অনুপ্রবেশ এবং একের পর এক হত্যাকাণ্ডের পরেও ইরানের কমান্ড ব্যবস্থা অটুট আছে। মোসাদ প্রধান ডেভিড বার্নেয়া এ বছরের শুরুতে ইরানকে ‘সহজ লক্ষ্য’ মনে করেছিলেন। সেই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
ইরানের জনগণের ভেতরেও দ্বন্দ্ব আছে। একদিকে জানুয়ারির বিক্ষোভের স্মৃতি, অন্যদিকে ট্রাম্পের হামলার বিরুদ্ধে ক্ষোভ। কিন্তু বাইরের শত্রুর বিরুদ্ধে ক্রোধটাই এখন বড় হয়ে উঠেছে। নতুন প্রজন্মের ইরানি যোদ্ধাদের প্রতিরোধ মানুষকে উজ্জীবিত করছে।
এই যুদ্ধের প্রভাব শুধু ইরানে সীমাবদ্ধ নেই। সিরিয়ায় গত সপ্তাহে বড় বিক্ষোভ হয়েছে। দামেস্ক থেকে শুরু করে আলেপ্পো, হোমস, ইদলিব পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিবাদ। আলেপ্পো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে হাজার হাজার শিক্ষার্থী সিরীয় ও ফিলিস্তিনি পতাকা হাতে স্লোগান দিয়েছে। জর্ডানেও ক্ষোভ বাড়ছে। আল-আকসা মসজিদ বন্ধ করে দেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তেজিত হয়েছে। একজন জর্ডানীয় সাংবাদিক আলী ইউনেস সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘জর্ডানে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এই যুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ইরানকে সমর্থন করছে, যদিও গ্রেপ্তারের ভয়ে তারা প্রকাশ্যে তা বলতে পারছে না।’
মিশরীয় বিশ্লেষক মামুন ফান্দি বলেছেন, ‘ইসরায়েল আবার আরবদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এমনকি মিসর, জর্ডান এবং আমার মতে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনেও যারা শান্তিচুক্তি করেছিল। ইসরায়েল এখন পুরোপুরি আরব শত্রুর তালিকায়। আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে শান্তির ধারণাটা এখন একটা হ্যালুসিনেশন।’
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে। ইউরোপে ডিজেলের দাম ৩০ শতাংশ বেড়েছে। ট্রাম্পের হামলা ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও কার্যকর একটি অস্ত্র দিয়ে দিয়েছে। সেটা হলো বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ।
এই পরিস্থিতিতে শান্তির প্রস্তাবও ব্যর্থ হচ্ছে। পাকিস্তান যুদ্ধবিরতি ও প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। ইরানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে সীমা এবং হরমুজ খুলে দেওয়ার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু দেশে তাকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলা হচ্ছে। ইরানের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব সাইদ হাদাদিয়ান বলেছেন, ‘আপনি আবোল-তাবোল বকছেন এবং ইসলামিক রিপাবলিকের ব্যাপারে ওষুধ দেওয়ার কোনো অধিকার আপনার নেই। তিন দিনের মধ্যে আপনার মন্তব্য প্রত্যাহার করুন এবং ক্ষমা চান।’

বিশ্লেষক মোহাম্মদ এসলামি ও জেইনাব মালাকুতি লিখেছেন, ‘ট্রাম্প মনে করছেন তেহরান হরমুজকে যুদ্ধবিরতি বা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। কিন্তু এই ধারণা ভুল হতে পারে। ইরান হরমুজকে যুদ্ধ শেষ করার হাতিয়ার নয়, বরং যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের স্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে দেখছে বলে মনে হচ্ছে।’
উপসাগরীয় দেশগুলো ট্রাম্পকে ইরান আক্রমণ করতে নিরুৎসাহিত করেছিল। কিন্তু তারপরেও তাদের তেল ও গ্যাস শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হোটেল ও বিমানবন্দরে হামলা হয়েছে। ট্রাম্প ও তার পরিবারের পেছনে বিনিয়োগ করা কোটি কোটি ডলারের বিনিময়ে তারা কিছুই পাননি।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই যুদ্ধ শেষে ইরান আরও শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে। ট্রাম্প ‘বিজয়’ ঘোষণা করে চলে গেলেও ইরান হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ছাড়বে না। আর মিসরীয় বিপ্লবের অন্যতম নেতা মোহাম্মদ এলবারাদেই বলেছেন, আরব বসন্ত মরে যায়নি, ঘুমিয়ে আছে। দারিদ্র্য, অসহায়ত্ব, অবিচার ও দুর্নীতির বাস্তবতা এখন আগের চেয়েও বেশি স্পষ্ট।
নেতানিয়াহু সারাজীবন ইরান আক্রমণের স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হতে গিয়ে আরব ও ইরানিদের, ধনী ও গরিব, সুন্নি ও শিয়া সবাইকে এক কাতারে এনে দিয়েছে।
যুদ্ধবিরতিতে ট্রাম্পের স্বস্তি শক্তিশালী অবস্থানে ইরান
যুদ্ধবিরতির শর্তগুলো নিয়ে এখনও বিভিন্ন অস্পষ্টতা ও ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, এই যুদ্ধবিরতি লেবাননসহ ‘সব জায়গার’ জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দ্রুতই তা অস্বীকার করে বলেছেন, লেবাননে ইসরায়েলের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
ট্রাম্পের দাবি ছিল, হরমুজ প্রণালি ‘সম্পূর্ণ, অবিলম্বে এবং নিরাপদে’ খুলে দেওয়ার শর্তে এই যুদ্ধবিরতি হয়েছে। তেহরান জাহাজ চলাচলে রাজি হলেও একটি বিশেষ শর্ত জুড়ে দিয়েছে। আর তা হলো, এই যাতায়াত হবে ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর সরাসরি নিয়ন্ত্রণে।
আঞ্চলিক সূত্রগুলো বলছে, ইরান তাদের আগের প্রস্তাব অনুযায়ী ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ভাগাভাগি করতে চায়। এমনকি প্রতিটি জাহাজ থেকে ২০ লাখ ডলার টোল আদায়ের পরিকল্পনাও করছে তারা। যদি এটি কার্যকর হয়, তবে প্রাক-যুদ্ধ পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটবে। আগে যা ছিল একটি মুক্ত জলপথ, এখন সেখানে ইরান হয়ে উঠবে একচ্ছত্র রক্ষক, যা তাদের আয়ের এক বিশাল নতুন উৎস তৈরি করবে।

এই অনিশ্চয়তার কারণে উপসাগরে আটকে থাকা শত শত জাহাজ বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও নতুন করে কোনও জাহাজ সেখানে প্রবেশে ভয় পাবে। এছাড়া ইরানকে টোল দেওয়া মার্কিন নিষেধাজ্ঞার লঙ্ঘন হবে কি না, তা নিয়ে জাহাজ মালিকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ রয়েছে।
যুদ্ধের পাঁচ সপ্তাহে ট্রাম্প ক্রমাগত ভয়ঙ্কর সব হুমকি দিয়েছিলেন। তার ধারণা ছিল, এই হুমকিতে তেহরান শেষ মুহূর্তে নতি স্বীকার করবে। কিন্তু বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্পের সেই কৌশল কাজে লাগেনি। আলোচনার ভিত্তি হিসেবে ট্রাম্পের দেওয়া ১৫ দফার পরিবর্তে ইরানের দেওয়া ১০ দফা পরিকল্পনাকেই গ্রহণ করা হয়েছে। আগের দিন যে প্রস্তাবকে ট্রাম্প সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, পরে তাকেই ‘আলোচনার জন্য কার্যকর ভিত্তি’ হিসেবে মেনে নিয়েছেন।
ইরানের ১০ দফার মধ্যে রয়েছে—সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকারের স্বীকৃতি। মজার ব্যাপার হলো, তেহরান সরকার তাদের যুদ্ধবিরতির শর্তের ফারসি সংস্করণে ‘ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকারের’ কথা উল্লেখ করলেও ইংরেজি অনুবাদে তা রাখেনি। ধারণা করা হচ্ছে, এটি অভ্যন্তরীণ জনমতকে শান্ত করতে এবং নিজেদের বিজয় প্রমাণ করতে করা হয়েছে।
ইরানের হাতে বর্তমানে ৪৪০ কেজি উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা তাত্ত্বিকভাবে ডজনখানেক পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরির জন্য যথেষ্ট। এটি তাদের জন্য আলোচনার টেবিলে সবচেয়ে শক্তিশালী তুরুপের তাস। আশ্চর্যের বিষয় হলো, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল-মার্কিন হামলার ঠিক দুই দিন আগে জেনেভায় অনুষ্ঠিত আলোচনায় ইরান এই মজুদ সমর্পণে প্রায় প্রস্তুত ছিল। অর্থাৎ, যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের তুলনায় ওয়াশিংটন এখন আরও দুর্বল অবস্থানে থেকে আলোচনায় বসছে।
ইসলামাবাদে ইরানের প্রতিনিধি দল যখন পৌঁছাবে, তখন তাদের হাতে বিশ্বকে দেখানোর মতো বড় সাফল্য থাকবে—পরম শত্রু সবটুকু শক্তি দিয়ে আক্রমণ করেও তাদের ধ্বংস করতে পারেনি। এমনকি সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পরও ইরানি বাহিনী লড়াই চালিয়ে গেছে এবং যুদ্ধবিরতির আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ইসরায়েল ও মার্কিন মিত্রদের লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।
পাকিস্তানের শান্তি আলোচনায় মার্কিন প্রতিনিধিরা হয়তো টেবিলে ঘুষি মেরে ইরানের শর্ত নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করবেন, কিন্তু তারা মনে মনে জানেন যে তাদের প্রতিপক্ষ (ইরান) এখন অনেক বেশি শক্তিশালী। জ্বালানি তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনকে চরম অস্বস্তিতে ফেলার পরীক্ষিত ক্ষমতা এখন তেহরানের হাতে।
ঐতিহাসিক বিজয় দাবি ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের, নেতানিয়াহুর বিপর্যয় দেখছেন বিরোধীরা
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদ বুধবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, যুদ্ধে তারা একটি ‘ঐতিহাসিক’ বিজয় অর্জন করেছে। পরিকল্পিত আলোচনার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে ১০ দফা প্রস্তাবের রূপরেখা মেনে নিতে বাধ্য করা গেছে।
পর্ষদ জানিয়েছে, এই প্রস্তাবের মধ্যে আছে হামলা না করার নিশ্চয়তা, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, অঞ্চলটি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ প্রদান।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, আগামী শুক্রবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে শুরু হতে যাওয়া আলোচনায় এই বিষয়গুলোর খুঁটিনাটি চূড়ান্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। তবে এই আলোচনার অর্থ যুদ্ধের সমাপ্তি নয়।

এদিকে বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছানোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ‘পূর্ণাঙ্গ বিজয়’ অর্জন করেছে। ট্রাম্প বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন চীন ইরানকে আলোচনায় বসতে রাজি করিয়েছে। ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বা পারমাণবিক জ্বালানির বিষয়টি ‘নিখুঁতভাবে দেখাশোনা করা হবে’।
তেলবাহী জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, ‘একটি দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির জন্য শক্তিশালী রূপরেখা তৈরি হয়েছে। আমাদের কাছে একটি ১৫ দফা আছে, যার অধিকাংশ বিষয়েই সম্মতি পাওয়া গেছে। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কী হয়।’
নেতানিয়াহুর বিপর্যয়
ইসরায়েলের প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ বুধবার ইরানের সঙ্গে হওয়া যুদ্ধবিরতির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন।
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম এক্সে ইয়ার লাপিদ লিখেছেন, ‘ইতিহাসে এর আগে কখনোই এমন রাজনৈতিক বিপর্যয় ঘটেনি। আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার মূল বিষয়গুলো নিয়ে যখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছিল, তখন ইসরায়েল আলোচনার টেবিলের ধারে কাছেও ছিল না।’
ইয়ার লাপিদ আরও লিখেছেন, ‘সেনাবাহিনীকে যা করতে বলা হয়েছিল তারা সবকিছুই করেছে। সাধারণ জনগণ অসামান্য সহনশীলতা দেখিয়েছে। কিন্তু নেতানিয়াহু রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি নিজের নির্ধারিত লক্ষ্যগুলোর একটিও অর্জন করতে পারেননি।’
দীর্ঘস্থায়ী শান্তির প্রত্যাশা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এ বিষয়ে ইসলামাবাদে চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির লক্ষ্যে আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
মঙ্গলবার ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। এর অংশ হিসেবে ইরান পুনরায় খুলে দেবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি, যার মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ হয়।

যুদ্ধবিরতির পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ প্রতিক্রিয়া
ইরাক: ইরাকের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, স্থায়ী সমাধানের জন্য উভয় পক্ষকে চুক্তি মেনে চলতে হবে এবং উত্তেজনা বৃদ্ধি থেকে বিরত থাকতে হবে।
মিশর: মিশর বলেছে, এই যুদ্ধবিরতি আলোচনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এবং সামরিক কার্যক্রম বন্ধ রেখে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করা উচিত।
ইসরায়েল: ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন। তবে তিনি বলেছেন, এই যুদ্ধবিরতি লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করে না, যেখানে ইসরায়েলি বাহিনী এখনও অভিযান চালাচ্ছে।
ওমান: ওমান যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, সংকটের স্থায়ী সমাধানে এখন আরও প্রচেষ্টা জোরদার করতে হবে।
জাতিসংঘ: জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যানোনিও গুতেরেস সব পক্ষকে যুদ্ধবিরতির শর্ত মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে একটি স্থায়ী ও বিস্তৃত শান্তির পথ তৈরি হয়।
জাপান: জাপান এই যুদ্ধবিরতিকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং দ্রুত চূড়ান্ত চুক্তির আশা প্রকাশ করেছে।
ইন্দোনেশিয়া: ইন্দোনেশিয়া উভয় পক্ষকে সার্বভৌমত্ব ও কূটনীতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে।
মালয়েশিয়া: মালয়েশিয়া বলেছে, এই যুদ্ধবিরতি উত্তেজনা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ এবং সব পক্ষকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
অস্ট্রেলিয়া: অস্ট্রেলিয়া সতর্ক করেছে যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহে বড় প্রভাব ফেলতে পারে এবং মানবিক ক্ষতি বাড়াবে।
নিউজিল্যান্ড: নিউজিল্যান্ড বলেছে, এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও স্থায়ী যুদ্ধবিরতির জন্য আরও কাজ বাকি রয়েছে।
জার্মানি: জার্মানি কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের ওপর জোর দিয়েছে এবং মধ্যস্থতায় পাকিস্তানের ভূমিকাকে ধন্যবাদ জানিয়েছে।
ইউক্রেন: ইউক্রেন এই যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, একই ধরনের দৃঢ় পদক্ষেপ রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করতেও প্রয়োজন।
কালের সমাজ/এসআর

