বলতে গেলে নীলফামারী জেলার অর্থনীতির চলন্ত চাকা সৈয়দপুর উপজেলা। এই উপজেলাটি রংপুর বিভাগের মধ্যে শিল্প সমৃদ্ধ। জেলার মোট রাজস্ব আয়ের শতকরা ৭৫ ভাগ জোগান দেয়া হয় সৈয়দপুর উপজেলা থেকে। অথচ সেই উপজেলার শিল্প নগরীতে চলছে অব্যাহত লোডশেডিং।
অবস্থা দেখে সাধারণরা মন্তব্য করেছেন লোডশেডিংয়ের চলছে প্রতিযোগিতা। এমন অবস্থায় সৈয়দপুর বিসিক শিল্প নগরীসহ স্থানীয় সব কলকারখানায় উৎপাদনে ধ্বস নেমেছে। পূর্বের তুলনায় উৎপাদন সিকিভাগে নেমে এসেছে। অথচ ব্যয়ের খাতায় যোগ হচ্ছে নতুন নতুন খরচ।
এদিকে লোডশেডিংয়ের কারণে শিল্প মালিকরাই শুধু ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে না। চলমান এ লোডশেডিংয়ে চলতি এসএসসি পরীক্ষার্থীদেরও পড়ালেখায় চরম ব্যাঘাত ঘটছে। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের চলছে ত্রাহি অবস্থা। সাধারণ ব্যবসায়ীরা চরম আর্থিক অনটনে পড়েছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নামে সন্ধ্যা ৭টায় বন্ধ করা হচ্ছে দোকানপাট। দিনের বেলায়েও লোডশেডিং। এ যেন শাখের করাতের মতো অবস্থা বলে বিশিষ্টজনরা তাদের মন্তব্যে জানিয়েছে।
এদিকে কাগজ কলম সম্পর্কিত সকল কাজ কম্পিউটার এবং ফটোকপি মেশিনে করার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে সব মানুষের। এমন ধরনের সকল কাজ ডিজিটাল পদ্ধতিতে করা হয় বিগত সরকারের আমল থেকে। মানুষ এ ধরনের কাজে পুরোপুরি অভ্যস্ত। কিন্তু বিদ্যুৎ সংযোগ ছাড়া ডিজিটাল পদ্ধতির কোনো কাজই করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সবচেয়ে ক্ষতির শিকার হচ্ছে কম্পিউটার ও ফটোকপি ব্যবসায়ীরা। ঘন্টায় ঘন্টায় লোডশেডিং হওয়ায় এ সেক্টরের ব্যবসায়ীদের নাভিশ্বাস উঠেছে।
কথা হয় এসএসসি পরীক্ষার্থী খালেদা নাজনীন অন্তরার সঙ্গে। সে জানায়, পরীক্ষার চাপ কমাতে আলো ও ফ্যানের নীচে বসে বই পড়ার কথা। কিন্তু বিদুতের ভেলকিবাজি অধ্যায়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গরম আর আলোহীন পরিবেশে পড়ার মনোযোগ সৃষ্টি করা দুঃস্কর হয়ে পড়েছে।
সৈয়দপুর ১০০ শয্যা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগী সতীশ রায় তার মন্তব্যে জানান, পেটের ব্যথা সহ্য করা যায় কিন্তু লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা হাসপাতালে অসহ্য হয়ে উঠেছে।
কথা হয় পপুলার ল্যাব এন্ড মিশন জেনারেল হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডাঃ দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, বিগত সময়েও লোডশেডিং হয়েছিল, জেনারেটরের বিদ্যুৎ দিয়ে তা মোকাবেলা করা হতো। পরিতাপের বিষয় বর্তমানে জেনারেটর চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় পেট্রোল বা অকটেনও চাহিদামতো মিলছে না। ফলে প্রাইভেট হাসপাতালের মালিকরা চরম উৎকন্ঠায় দিন অতিবাহিত করছে।
ক্ষুদ্র শিল্প ব্যবসায়ী ও সাবেক পৌর কাউন্সিলর আকতার হোসেন ফেকু জানান, প্রতি ঘন্টায় লোডশেডিং হওয়াতে আমাদের মতো ক্ষুদ্র শিল্প মালিকরা কঠিন দুঃসময় পার করছি। মিল চালু করার ঘন্টা পার না হতেই লোডশেডিং দেয়া হচ্ছে। এতে করে মেশিনের আয়ুস্কাল কমে যাচ্ছে। যে মেশিন পাঁচ বছর চলতো, তা তিন বছরে বিনষ্ট হয়ে যাবে।
কম্পিউটার ব্যবসায়ী খালিদ আরমান ক্ষোভ ঝেড়ে বললেন, লোডশেডিংয়ে আমাদের ব্যবসা লাটে উঠতে বসেছে। কিন্তু দোকান ভাড়া, ঘর ভাড়া ও সংসারের খরচ বেড়ে গেছে। তার মতে বিদ্যুতের এমন অবস্থা দীর্ঘদিন চললে আমাদের মতো ব্যবসায়ীদের রাস্তায় নামতে হবে।
সৈয়দপুর শিল্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহে নিরবিচ্ছিন্ন না থাকায় শিল্প মালিকদের নাভিশ্বাস চলছে। তার মতে, আমাদের এমনও মেশিন আছে যা চালু করতে সময় লাগে এক থেকে দেড় ঘন্টা। অথচ তিন ঘন্টা বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়ার পর শুরু হয় লোডশেডিং।
এর ফলে আমরা উৎপাদন করার সুযোগ পাই মাত্র দেড় ঘন্টা। ওই ব্যবসায়ী নেতার মতে, বর্তমান বাস্তবতায় লোডশেডিং দেয়া হোক, তবে কমপক্ষে আট ঘন্টা নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ দেয়ার পর, বিশেষ করে বিসিক শিল্প নগরীতে। এমন অবস্থা চললে আমরা তিন শিফটের জায়গায় কারখানা দুই শিফট চালাবো। এর ফলে মুনাফা না হলেও শিল্প বেঁচে থাকবে। তিনি আক্ষেপের সুরে আরো বলেন, বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন সিকিভাগে ঠেকলেও ভ্যাট, আয়কর, পরিবেশ, কলকারখানা পরিদর্শক, পৌর কর্তৃপক্ষ ও বিএসটিআই কর্মকর্তাদের চাপ পূর্বের তুলনায় বর্তমান সময়ে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এছাড়াও ব্যাংকের ঋণ এবং ব্যাংকের সুদের টাকা ব্যবসায়ীদের করছে নাজেহাল। তিনি বলেন, উৎপাদন আর বিপণন সমানতালে চললে শিল্প মালিকদের অর্থনীতির চাকা ঘূর্ণায়মান থাকে। অথচ লোডশেডিং আমাদের দুরাবস্থায় ফেলে দিয়েছে। এসব বিষয়ে তিনি সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের আশুদৃষ্টি দেয়ার দাবি জানিয়েছেন।
বিদ্যুৎ বিভ্রাট নিয়ে কথা হয় নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসির (নেসকো) সৈয়দপুর বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম সেলিমের সঙ্গে। বিসিক শিল্পনগরীতে নিরিবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবাহের দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা শিল্প কারখানায় বেশি বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে চাই। নেসকো কর্তৃপক্ষ শিল্প মালিকদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ বিক্রি করে বেশি মুনাফা করে।
কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় তা সম্ভবপর নয়। তারপরও উৎপাদন অব্যাহত রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হবে। ওই কর্মকর্তার মতে, আমাদের জুড়িডিকশনে ষাট হাজার গ্রাহক রয়েছে। বিদ্যুতের প্রয়োজন কমপক্ষে ৪৫ মেগাওয়াট। সেখানে গড়ে ৮ থেকে ১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ মিলছে ন্যাশনাল গ্রিড থেকে। তাই ওই বিদ্যুৎ দিয়েই সৈয়দপুর সেনানিবাস, সৈয়দপুর বিমানবন্দর, সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা, সৈয়দপুর বিসিক শিল্পনগরী সহ ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। শিল্প মালিকদের তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন, আপনাদের চাহিদার কথা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।
কালের সমাজ/কে.পি

