লোকসংস্কৃতি কেবল অতীতের স্মৃতি নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, ইতিহাস ও জীবনচর্চার গভীরতম ধারক। সেই চেতনাকে আরও বিস্তৃত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার প্রত্যয়ে গত ২০ মে হাওড়ার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শরৎ সদনে অনুষ্ঠিত হলো জাতীয় লোকসংস্কৃতি পরিষদের প্রথম ত্রি-বার্ষিক হাওড়া মিলন উৎসব–২০২৬।
উৎসবমুখর পরিবেশ, ব্যাপক অংশগ্রহণ এবং প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক আবহে দিনব্যাপী এই আয়োজন পরিণত হয় লোকঐতিহ্যের এক অনন্য মিলনমেলায়।
প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের শুভ উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক আরণ্যক বসু।
প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক ও খ্যাতিমান লোকসংস্কৃতি গবেষক ড. লক্ষণ কর্মকার। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রসগল্পকার রাখাল মজুমদার, প্রবন্ধকার ড. দেবব্রত দেব রায়, কবি পার্থ বসু এবং পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ড. অমিত চট্টোপাধ্যায়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় লোকসংস্কৃতি পরিষদের সর্বভারতীয় সভাপতি ও লোকসংস্কৃতি-ইতিহাস গবেষক মণ্টু দাস।
উৎসবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অংশ নেন কবি, সাহিত্যিক, গবেষক ও সংস্কৃতিকর্মীরা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন কবি বিশ্বজিৎ রায়চৌধুরী, বাচিক শিল্পী ড. মোজাহিদ রহমান, সাহিত্যিক শক্তি পুরকাইত, গবেষক ও কবি অরূপ ভূঁইয়া, কবি রূপ কুমার পাল, সম্পাদিকা ড. অপর্ণা গাঙ্গুলী, কবি আলাল উদ্দিন, সন্ধ্যা দেবনাথ, জগদীশ দেবনাথ, রতন চন্দ, গল্পকার দেবেশ মিত্র, কবি প্রতিমা সরকার, নিভা চৌধুরী, লালন গবেষক বরুণ চক্রবর্তী এবং লোকসংগীত শিল্পী সোমা দত্তসহ শতাধিক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।
স্বাগত বক্তব্যে ড. অমিত চট্টোপাধ্যায় বলেন, লোকসংস্কৃতি গবেষণার মাধ্যমে হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং গবেষণার ক্ষেত্রকে আরও সমৃদ্ধ করাই পরিষদের মূল লক্ষ্য। উদ্বোধনী বক্তব্যে আরণ্যক বসু এই উদ্যোগকে সময়োপযোগী উল্লেখ করে বলেন, লোকসংস্কৃতির সংরক্ষণ ও বিকাশে এমন ধারাবাহিক উদ্যোগ সমাজকে সাংস্কৃতিকভাবে আরও সমৃদ্ধ করবে।
প্রধান অতিথি ড. লক্ষণ কর্মকার তাঁর বক্তব্যে লোকসংস্কৃতির ধারাবাহিক বিবর্তনের বিশ্লেষণ তুলে ধরে বলেন, আধুনিকতার প্রবল প্রবাহের মধ্যেও লোকশিল্প ও লোকঐতিহ্য নিজেকে নতুনভাবে অভিযোজিত করে টিকে থাকার সক্ষমতা রাখে। প্রয়োজন কেবল সচেতন চর্চা এবং প্রজন্মান্তরে তার সঠিক সেতুবন্ধন।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল প্রকাশনা ও সম্মাননা পর্ব। পরিষদের মুখপত্র "লোকজ"–এর উদ্বোধন করেন আরণ্যক বসু। পাশাপাশি রতন চন্দ সম্পাদিত সাহিত্যপত্র "শতদল"–এর মোড়ক উন্মোচন করেন ড. লক্ষণ কর্মকার এবং বিশ্বজিৎ রায়চৌধুরীর কাব্যগ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করেন ড. দেবব্রত দেব রায়।
এক আবেগঘন মুহূর্তের সৃষ্টি হয় যখন গল্পকার ও সাংবাদিক দেবেশ মিত্র অসমের ঐতিহ্যবাহী ফুলাম গামছা পরিয়ে মণ্টু দাস ও ড. অমিত চট্টোপাধ্যায়কে সংবর্ধনা জানান। পরবর্তীতে পার্থ বসু, আরণ্যক বসু ও ড. লক্ষণ কর্মকারকে বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত করা হয়।
প্রথম অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন সভাপতি মণ্টু দাস। দ্বিতীয় অধিবেশনে সভাপতিমণ্ডলীতে ছিলেন বিশ্বজিৎ রায়চৌধুরী, ড. মোজাহিদ রহমান, অরূপ ভূঁইয়া ও রূপ কুমার পাল। অধিবেশনের সূচনায় লোকসংগীত পরিবেশন করেন সোমা দত্ত। পরে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের পরিবেশনা, কবিদের স্বরচিত কবিতা পাঠ এবং আলোচনা পর্বের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দিনব্যাপী এই সাংস্কৃতিক আয়োজন।
কালের সমাজ/কে.পি

