জীবনের প্রয়োজনে কখনো ডাটা এন্ট্রি অপারেটর, কখনো গার্মেন্টস কর্মী, আবার কখনোবা উবার চালক (ড্রাইভার) হিসেবে কাজ করেছেন। সংগ্রামের সেই পথ পেরিয়েই আজ সফল ফ্রিল্যান্সার ও ব্র্যান্ডিং বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিজের পরিচয় তৈরি করে নিয়েছেন।
বলছি মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার পোয়াইল গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা তুহিন আল মামুন-এর কথা। ধৈর্য, পরিশ্রম আর শেখার অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে সঙ্গী করে তিনি এখন কাজ করছেন দেশি-বিদেশি ক্লায়েন্টদের সঙ্গে। পাশাপাশি নতুনদেরও দেখাচ্ছেন আত্মনির্ভর হওয়ার পথ। বর্তমানে তুহিন আল মামুন মাসে আয় করছেন এক থেকে দেড় লাখ টাকা।
মহম্মদপুর উপজেলার পোয়াইল গ্রামের মো. মিজানুর রহমানের ছেলে তুহিন আল মামুন বর্তমানে কাজের প্রয়োজনে ঢাকায় অবস্থান করছেন। ছোটবেলা থেকেই সৃজনশীল কাজের প্রতি তার আলাদা আগ্রহ ছিল। যদিও শুরুতে কোনো নির্দিষ্ট পেশাকে লক্ষ্য করে এগোননি, তবে ধীরে ধীরে ডিজাইন এবং প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ থেকে তার পথচলা শুরু হয়।
পড়ালেখার পাশাপাশি নিজের প্রচেষ্টাতেই ডিজাইনের কাজ শেখা শুরু করেন তিনি। তবে সফলতার পথ মোটেও সহজ ছিল না। ফ্রিল্যান্সিংয়ে আসার আগে জীবনের বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের কাজ করেছেন তুহিন। বন্ধু আল আমিনের সঙ্গে একটি ছোট আইটি ফার্মে ডাটা এন্ট্রির কাজ, এসআর পোস্টে চাকরি, এয়ারটেল কোম্পানিতে কাজ, গার্মেন্টস, ফাইভ স্টার হোটেল, উবার ড্রাইভার এবং বিকাশ প্রজেক্টেও কাজ করেছেন তিনি।
জীবনের এসব অভিজ্ঞতাই তাকে বাস্তবতা শিখিয়েছে এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছে। পরবর্তীতে বন্ধু রাকিব এবং তার সহধর্মিণী মনিরার সহযোগিতায় ২০১৭ সালে ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ পান তুহিন আল মামুন।
তুহিন আল মামুন বলেন, জীবনের প্রতিটি টার্নিং পয়েন্টে তিনি ভিন্ন ভিন্ন মানুষের সহযোগিতা পেয়েছেন। তার মতে, একজন মানুষকে সফলতার শিখরে পৌঁছাতে হলে কিছু মানুষের সহায়তা, দিকনির্দেশনা এবং বিশ্বাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শুরুর দিকে ছোট ছোট ডিজাইনের কাজ যেমন-লোগো, সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট এবং সাধারণ ব্র্যান্ডিং সম্পর্কিত কাজ করতেন তুহিন। প্রথম ইনকাম খুব বড় না হলেও সেই অনুভূতি তাকে নতুনভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
তুহিন আল মামুন জানান, শুরুতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সঠিক গাইডলাইন ও প্রশিক্ষণের। তখন সহজলভ্য কোনো আইটি ট্রেনিং সেন্টার বা নির্ভরযোগ্য কোনো দিক-নির্দেশনা ছিল না। ফলে অনেক সময় হতাশাও কাজ করেছে।
তিনি বলেন, “ফ্রিল্যান্সিংয়ে কোনো নির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ নিশ্চিত থাকে না। অনেক সময় মনে হয়েছে হাল ছেড়ে দেই। কিন্তু নিজেকে সবসময় মনে করিয়ে দিতাম কেন এই পথ শুরু করেছিলাম।”
ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট আসে যখন তিনি ব্র্যান্ডিংয়ে ফোকাস করা শুরু করেন এবং প্রফেশনালভাবে ক্লায়েন্ট হ্যান্ডেলিং শেখেন। এরপর নিয়মিত কাজ, কাজের মান বজায় রাখা এবং ক্লায়েন্টদের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ তৈরির মাধ্যমে ধীরে ধীরে তার কাজের পরিধি ও আয় বাড়তে থাকে।
বর্তমানে তিনি ফুল ব্র্যান্ডিং, লোগো ডিজাইন এবং বিভিন্ন ধরনের গ্রাফিক ডিজাইন সার্ভিস নিয়ে কাজ করছেন। ফাইবারসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কাজ করার পাশাপাশি সরাসরি আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টও হ্যান্ডল করছেন তিনি। ২৯ বছর বয়সী তুহিন আল মামুন বর্তমানে মাসে আয় করছেন এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা।
শুধু নিজের ক্যারিয়ার গড়াতেই থেমে থাকেননি তুহিন আল মামুন। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে নতুনদের গাইড করাও শুরু করেছেন তিনি। তার মাধ্যমে ইতোমধ্যে অনেক তরুণ ফ্রিল্যান্সিং থেকে আয় শুরু করেছেন বলে জানান তিনি।
একজন মেন্টর হিসেবে সবচেয়ে বড় সন্তুষ্টির জায়গা কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সবচেয়ে বড় ভালো লাগা তখনই কাজ করে, যখন দেখি আমার শিক্ষার্থীরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে এবং পরিবারের দায়িত্ব নিতে পারছে।”
তুহিন আল মামুন মনে করেন, বাংলাদেশের তরুণদের জন্য ফ্রিল্যান্সিং বড় একটি সম্ভাবনার জায়গা। তবে এই খাতে সফল হতে হলে ধৈর্য, নিয়মিত শেখার মানসিকতা এবং দীর্ঘ সময় ধরে লেগে থাকার কোনো বিকল্প নেই।
কালের সমাজ/এসআর

